রোববার, ২৯ নভেম্বর ২০২০ | ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
সাক্ষাৎকার

‘পুঁজিবাজার হবে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের কেন্দ্র’

উদয় হাকিম
০১ জুলাই ২০২০

তার পরিচয় সৎ, সাহসী, দেশপ্রেমিক এবং দূরদর্শী মানুষ হিসেবে।  মেধা, অভিজ্ঞতা এবং নেতৃত্বগুণ তাকে করেছে ঋদ্ধ। ছিলেন প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন।  সম্প্রতি সরকার তাকে নিয়োগ দিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান হিসেবে।  তিনি অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম।  কমিশনের আগারগাঁও অফিসে তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাইজিংবিডির উপদেষ্টা সম্পাদক উদয় হাকিম। সঙ্গে ছিলেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক নুরুজ্জামান তানিম।

উদয় হাকিম: আপনি সাধারণ বিমা করপোরেশনের চেয়ারম্যান ছিলেন। সেখানে দারুণ প্রসংশনীয় কিছু কাজ করেছেন। দায়িত্ব নিয়েছেন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে।  পুঁজিবাজারকে নিয়ে আপনার ভিশন কী?

শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম: ক্যাপিটাল মার্কেট কিন্তু শুধুমাত্র ইক্যুইটি বেজড নয়। যেখানে বিনিয়োগকারীরা শুধু শেয়ারের প্রাইস উঠল না কমল, ইনডেক্স বাড়ল না কমলো, এসবের প্রতি সারাক্ষণ তাকিয়ে থাকে। ক্যাপিটাল মার্কেটে আরো অনেক কম্পোনেন্ট রয়েছে। সেগুলো আমরা কখনোই আনতে পারিনি।  যে কারণে ক্যাপিটাল মার্কেট বললেই শেয়ার কেনাবেচার কথা বুঝি।

বিশ্ব বাজারে তেলের দাম কমে ৫ থেকে ১০ ডলারে চলে এসেছিল।  ওই সময় যতটুক সম্ভব তেল স্টোর করে ফরওয়ার্ড মার্কেটে বিক্রি করতে পারতাম। তাহলে আমাদের রিজার্ভ অনেক বেড়ে যেত। এই ফরওয়ার্ড পারচেজ আমরা কোনো দিন করি নাই।  আমাদের এফডিআর এর কথা চিন্তা করুন। ব্যাংকগুলো এক বছরের জন্য নেওয়া এফডিআর এর অর্থ ৫ থেকে ১০ বছরের জন্য লোন দিচ্ছে।  ফলে তাদের লিক্যুইডিটি ম্যানেজমেন্ট বা তারল্য ব্যবস্থাপনায় সমস্যা হচ্ছে। কারণ এক বছর পর আমানতকারীকে ওই এফডিআরের অর্থ ফেরত দিতে হচ্ছে।  কিন্তু এক বছরের ওই টাকার বিপরীতে লোন দেওয়া হচ্ছে ৫ থেকে ১০ বছরের জন্য।  এতে লিক্যুইডিটি ইমব্যালেন্সড হয়ে যায়। বিভিন্ন কারণে অ্যাকাউন্ট ক্লাসিফাইড হয়ে যায়। ব্যাংকিং সেক্টরে ননপারফরমিং লোন বাড়তে থাকে।

বিদেশে কিন্তু ব্যাংকের গ্রাহকরা সাধারণত ৫ থেকে ১০ বছরের জন্য লোন নেয় না।  সেখানকার গ্রাহকরা ব্যাংক থেকে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি ট্রেড ফাইন্যান্স, এক্সপোর্ট ফাইন্যান্স, ইমপোর্ট ফাইন্যান্স, রিটেইল ফাইন্যান্স ইত্যাদি লোন নিয়ে থাকে।

ক্যাপিটাল মার্কেটে যদি ১০ বছরের জন্য বন্ড দিই, সেখানে পরিশোধগত কোনও ঝামেলা নেই। কোনও বছর দিতে না পারলে, পরের বছর পূর্বের বছরেরটা একসঙ্গে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।  এতে অ্যাকাউন্ট ক্লাসিফাইড হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

তাই ক্যাপিটাল মার্কেট হবে দীর্ঘমেয়াদি ফাইন্যান্সিং এর কেন্দ্রস্থল। আর স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি ফাইন্যান্সিং করবে ব্যাংকিং সেক্টর।  এতে একদিকে তাদের লিক্যুইডিটি বা তারল্য ব্যবস্থাপনা যেমন অনেক সহজ হবে।  অন্যদিকে নন-পারফর্মিং লোনও কমে আসবে।

পাশাপাশি ক্যাপিটাল মার্কেট যদি দীর্ঘমেয়াদি ফাইন্যান্সিং এর ব্যবস্থা করতে পারে, তাহলে ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানগুলোও প্রত্যেক মাসে মাসে কিস্তি পরিশোধ করা, ঋণ শ্রেণিকরণের ঝামেলাসহ বিভিন্ন ধরনের চাপে পড়া থেকে রক্ষা পাবে। তাদের ব্যবসায়িক কাজেও কোনো ব্যাঘাত ঘটবে না।  দীর্ঘমেয়াদি ফাইন্যান্সিং এর মাধ্যমে ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানগুলো যখন ফিন্যান্সিয়াল সল্যুশনস পাবে, তখন তারা স্বস্তিতে ব্যবসা করতে পারবেন।

ক্যাপিটাল মার্কেট যদি ঠিকভাবে কাজ করে, তাহলে আমাদের এসব দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।  আমরা সেই সংকল্প নিয়ে কাজ করছি।  আমাদের মেয়াদে ক্যাপিটাল মার্কেটকে সেই জায়গায় নিয়ে যেতে চাই।

উদয় হাকিম: উন্নত দেশগুলোতে দেখা যায় ব্যবসার দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের মূল উৎস হচ্ছে শেয়ারবাজার। কিন্তু আমাদের দেশে তা হচ্ছে না। আপনার মেয়াদে কী এটি করতে চাইছেন?

শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম: হ্যাঁ। ইতিমধ্যে বন্ডের কাজ শুরু হয়েছে। আর ডেরিভিটিভস যেহেতু আমাদের দেশে অনেকেই ঠিকমত বোঝে না।  তাই এসব বিষয়ে ধারণা দিতে ফাইন্যান্সিয়াল লিটেরেসি প্রোগ্রাম চালু করেছি। বন্ড জনপ্রিয় করতে ফাইন্যান্সিয়াল লিটেরেসির মাধ্যমে আমরা ডেরিভিটিভস সম্পর্কে মানুষকে শিখিয়ে নেব।  এখন অনলাইনে ফাইন্যান্সিয়াল লিটেরেসির কার্যক্রম চলছে। শেখা শেষ হলে তখন ডেরিভিটিভস মার্কেট চালু করব।  যদিও এ সম্পর্কিত রুলস চালু হয়েছে।  আবার কিছু রুলস পরিবর্তনের কাজ চলছে।  ফাইন্স্যাসিয়াল লিটেরেসির ওপর জোর দিয়েছি। ধীরে ধীরে মার্কেট ক্যাপ বাড়াব।  বন্ড ট্রেড চালু করব। সরকারি ট্রেজারি বন্ড চালু করব।  যখন এগুলো চালু করা হবে তখন মার্কেট ক্যাপ বেড়ে যাবে।  ইনডেক্স চেঞ্জ হয়ে যাবে।  তখন শুধু শেয়ারের দাম বাড়ল না কমল, কেউ এটা নিয়ে কথা বলবে না। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য বন্ডের সুযোগ রাখা হবে। বন্ডের ব্যবহার সহজেই শেখা সম্ভব। ইতিমধ্যে সরকারি ট্রেজারি বন্ড চালুর বিষয়ে মার্কেট রেডি হয়েছে।  বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা চলছে।  এ বছরই সরকারি ট্রেজারি বন্ড চালু করা হবে।

উদয় হাকিম: ক্যাপিটাল মার্কেটে পুঞ্জিভূত নানা সমস্যা আছে। এই চ্যালেঞ্জগুলোকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম: বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। পরিবর্তীত বাংলাদেশে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ আসবে।  সেটা ফেস করতেই হবে।  সামনের দিকে এগিয়ে যেতে যা করণীয় তাই করতে হবে।  এগুলোকে ভয় পেলে চলবে না।  দুষ্টলোক তার কাজ করবেই। তবে পেছন দিকে তাকালে হবে না। প্রত্যেকটি ভালো কাজের সমালোচনা করার লোক রয়েছে।  আমাদের দেশের দুর্ভাগ্য যে, ক্রিয়েটর থেকে ক্রিটিকের সংখ্যা বেশি হয়ে গেছে।  আমাদের যেদিন ক্রিয়েটরের সংখ্যা বেশি হবে, সেদিন এ দেশের উন্নতি হবে।  ক্রিটিসিজম ভালো, তবে আমাদের এখন ক্রিয়েটর দরকার। দেশ এগিয়ে যেতে হলে সবাইকে ক্রিয়েটরের ভূমিকা পালন করতে হবে। ক্রিটিসিজম কনসট্রাক্টিভ হতে পারে। তবে তার সংখ্যা বেশি হলে ক্রিয়েটরদের বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়।

উদয় হাকিমের উপস্থাপনায় লাইভ শো ‘ত্রিবেণী’
নারীকে নিয়ে কী বীভৎস মজা

আপনার মতামত লিখুন