রোববার, ২৯ নভেম্বর ২০২০ | ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
দেখা থেকে লেখা

ক্যাবল কারে মালয়েশিয়ার গেন্টিং হাইল্যান্ডসের সৌন্দর্য্য

মালয়েশিয়া থেকে ফিরে মোস্তফা ইমরুল কায়েস
০৪ জুলাই ২০২০

হোটেল থেকে বের হয়ে গাড়িতে বসতেই সেটি ছুটতে শুরু করলো মালয়েশিয়ার পাহাড়ি এলাকার গেন্টিং হাইল্যান্ডসের দিকে। এ পাহাড় নাকি পর্যটনের দ্বার খুলে দিয়েছে। সেটি চোখে দেখতেই ছুটছি আমরা। শহর পেরিয়ে গাড়ি ঢুকছে পাহাড়ের বুকে। আঁকা বাঁকাপথ, দুই ধারে সবুজের চাঁদর জড়ানো। দূরে তাকালে পাহাড়কে জড়িয়ে ধরার চেষ্টারত মেঘমালাকে বিধবানারীর সাদা শাড়ি বলে বার বার ভুল হচ্ছিল। 

ক্যাবলকার থেকে চোখে দেখা নিচের দৃশ্য, এক একটি পাহাড় কেটে বানানো হয়েছে সাপের মত একেবেকে চলা রাস্তা ও বিনোদন কেন্দ্র

কখনো কখনো বিচ্ছিন্ন দুই পাহাড়ের আঁকাবাকাঁ পথকে সংযুক্ত করে দিয়েছে ভাসমান সেতু। এসব যখন ভাবছি, সে সময় আমাদের বহনকারী গাড়িটি যেন সাপের শরীরে ভর করে ছুটছিল। পাহাড়ে ওঠার জন্য যেন একটি বড় অজগর শুয়ে ছিল, আর তাতে ভর করে গাড়ি পৌঁছালো গেন্টিং হাইল্যান্ডের ঢালে। ঢালের পাহাড়গুলো যেন তাকে সেজদাহ করে তার পায়ে শুয়ে আছে লম্বা সেই অজগর।স্কাইওয়ের নিচে গাড়ি পার্ক করা হলো। সকলে লিফট বেয়ে উপরে উঠে গেলাম। গেন্টিং হাইল্যান্ডসে যাওয়ার জন্য ক্যাবলকার চড়তে হবে। এজন্য কিছু আনুষ্ঠানিকতা সেরে লাইন দাঁড়ানো হলো। 

ক্যাবল কারে বসা লেখক, পাশেই ছুটে  চলেছে আরো কিছু ক্যাবলকার

দুটি করে টোকেন হাতে ধরিয়ে দিলেন ইউএস-বাংলার মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) কামরুল ইসলাম। সঙ্গে কতক্ষণ, কিভাবে ফেরা হবে, নানা দিক নির্দেশনাও দিলেন তিনি। কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা পৌঁছে গেলাম ক্যাবলকার যাত্রার ওয়ানা স্টেশনে। ক্যাবলে চড়ার আগে সবার কম বেশি স্ন্যাপস (ছবি) নিয়ে রাখলেন ইরানি নারী আলমিনা। সাথে একটি টোকেন ধরিয়ে দিলেন। যাতে শেষ স্টেশনে তার হাতে তোলা ছবিটা সংগ্রহ করা সহজ হয়। ক্যাবল কারের সাথে কারও কারও সখ্যতা হবে এটাই প্রথম। রোমাঞ্চকর অনুভূতির জোয়ার বইতে শুরু করলো সবার মনে। ওয়ানা স্টেশনে দুই-এক মিনিট পর পর আসছে আর যাচ্ছে একটি করে ক্যাবলকার। লাল রঙের ক্যাবল কারে চেপে বসলাম আমরা। এখানে বলে রাখা ভালো, প্রতিটি ক্যাবলকারে আট থেকে দশজন উঠা যায়। তবে আমরা উঠেছিলাম মাত্র ছয় জন। ওয়ানা স্টেশনকে পেছনে ফেলে পাহাড়ের পেটে ঢুকছে ক্যাবলকার। নিচে তাকালেই কলিজা উড়ে যাচ্ছিল। সবুজ আর সবুজ। কিছু দূর যেতে চোখে ভাসলো পাহাড়ে আচড়ের দাগ। 

গেন্টিং হাইল্যান্ডসের চুড়ার গেন্টিং হোটেলের সামনে লেখক

পরে বুঝলাম পাহাড়কে আঁচড় দেওয়ার মতো আর কোন দানব আছে? আচড় নয়, সেগুলো পাহাড়ি রাস্তা। জিলাপির প্যাঁচ মারা রাস্তায় তৈরি হয়েছে পিচ ঢালাপথ। তা ব্যবহার করেই কিছু গাড়ি উঠছে আর নামছে।সবুজ জড়ানো পাহাড়গুলোর বুক গাছগাছালিতে অন্ধকার। গাছের নিচে কোনো কিছুই দেখা যাচ্ছে না। মনের ভেতর কেমন যেন ছমছম করে উঠছে। নিচের দিকে তাকালে মনে হচ্ছে, একা এই গহীন জঙ্গলে ক্যাবল কার ছিঁড়ে পড়লেই হাড়গোড় শেষ। ক্যাবলকার আমাদের নিয়ে ছুটছে হাজার ফুট উপর দিয়ে। এমন সময় হালকা ঠাণ্ডা বাতাসে সামান্য দুলে উঠল ক্যাবল কার, সঙ্গে বৃষ্টির ঝাপটা। ভীষণ ভয় লাগছিল, যদি ছিঁড়ে নিচে পড়ে যাই!বৃষ্টি আর বাতাসের ফাঁকে চলছে সেলবাজদের সেলফি। যেন ছবি তোলার হিড়িক পড়ে গেল ক্যাবলকার জুড়ে। কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ মুখে ভেঙচি কেটে সেলফি তোলা শুরু করলো। দেখতে দেখতেই ক্যাবলকার পৌঁছে গেল পাহাড়ের চূড়ায়। তিনটি তারে জড়িয়ে ক্যাবলকারগুলো আসা যাওয়া করছে। কারও মাঝে নেই কোনো তাড়া হুড়ো। ওয়ানা থেকে হাইল্যান্ডস যেতে কয়েকটি স্টেশন পড়লো। আর এসব স্টেশনে কাবল থেকে নামলেই কিন্তু আক্কেল সেলামি দিতে হবে, আবারও আপনাকে নতুন করে ক্যাবল ভ্রমণের টিকেট কাটতে হবে। 

ক্যাবল থেকে নিচ তাকালেই দেখা মিলছে সাপের মতো রাস্তাগুলোর। যেগুলো ধরে পিঁপড়ার মতো ছুটছে গাড়ি। এরই ফাঁকে একটি পাহাড়ে মন্দিরের দেখা মিললো।ক্যাবল কার থেকে দূরের পাহাড়ে তাকালে সবুজে আচ্ছাদিত পাহাড়গুলো মেঘের কোলে ডুব দিচ্ছে মনে হবে। 

এসব পাহাড়ের চূড়াকেই বলা হয় গেন্টিং হাইল্যান্ডস। যার উচ্চতা পাঁচ হাজার ফুট বলে জানালেন আমাদের গাইড অ্যান্ডু। আর এ পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন উঁচু উঁচু ভবন, গাড়ি পার্কিং করার সমতল জায়গা, হোটেল আর মোটেল এবং বিনোদন কেন্দ্র, জুয়ার ক্যাসিনো, বার (মদের দোকান), মার্কেট আর বিভিন্ন দেশের খাবারে ভরা রেস্টুরেন্ট। নানা দৃশ্য দেখে দেখে ক্ষুধার্ত চোখের ক্ষুধা কিছুটা মিটলো। এসব ভাবতে ভাবতে ক্যাবলকার পৌঁছলো হাইল্যান্ডসে। সবাই নেমে যে যার মত করে ছুট দিলো। 

তবে দুপুরের আগেই সবাইকে এই একই জায়গায় মিলিত হতে হবে বলে জানিয়ে দিলেন গাইডস (ভ্রমনের নির্দেশনাকারী ব্যক্তি)। নেমে মনে হলো, যেন হিমালয়ের কোনো দেশে এসে পৌঁছলাম। গেন্টিংকে মালয়েশিয়ার মন্টিকার্লো বলা হয়ে থাকে।পাহাড়ে বুকে এত বড় বড় ভবন কি করে নির্মাণ করা হয়েছিল, কারা তৈরি করেছিলেন এসব নান্দনিক ভবন আর কত জন লোক কত বছর ধরেই বা সেগুলো তৈরি করেছিল? এমন হাজারো প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল মনে আর ভালই লাগছিল।

 হাইল্যান্ডসের চূড়ায় শুধু মার্কেট আর রেস্টুরেন্টে ভরা। নতুন কোনো শহরে এসেছেন বলে ভুল করে বসবেন। প্রত্যেক রেস্টুরেন্টে পর্যটক খাচ্ছেন আর কেউ বসে বসে গল্প করছেন। এরই মাঝে একটি রেস্টুরেন্টে পাওয়া গেল এক বাঙালি কর্মচারীকে। বগুড়ার আজিজ নামের সেই যুবক জানালেন, প্রতিদিন সেখানে প্রায় লাখ খানেকেরও বেশি মানুষ দেখতে, কিনতে আর ঘুরতে যান। সেখানে তারা ঘোরাঘুরি আর মার্কেট শেষে রেস্টুরেন্টগুলোতে বসে যান খাওয়ার জন্য। তার সাথে গল্প করেই উঠে গেলাম গেন্টিং কমপ্লেক্সের চূড়ায়। যেখানে বানানো হয়েছে আলিশান হোটেল, মার্কেট, ক্যাসিনো। হাইল্যান্ডের চূড়ায় গেলে দেখা মিলবে সুউচ্চ নান্দনিক হোটেল গেন্টিং গ্রান্ড আর হোটেল ম্যাক্সিমের। এই চূড়ায় বেশির ভাগ থাই, চাইনিজ, ইন্দোনেশিয়ান আর বাঙালিরা আসেন ক্যাসিনোতে। ক্যাসিনো এক প্রকার জুয়ার আসর। তবে তা আধুনিক এদেশটিতে বৈধ একটি খেলা। 

বাঙালিদের মুখে অনেক গল্প ঘুরে, গেন্টিং গ্রান্ড আর হোটেল ম্যাক্সিমের ক্যাসেনোতে এসে জুয়ার আসরে বসে অনেক বাঙালি রাতারাতি ধনী বনে গেছেন। আবার কেউ কেউ লাখ রিঙ্গিতও (মালয়েশিয়ার টাকা) খুইয়েছেন। এই সব হোটেল শুধু মার্কেট করা আর ক্যাসিনো খেলা নয়, মন চাইলে দুইশ থেকে ৫০০ রিঙিতে থাকতেও পারেন।গেন্টিং হাইল্যান্ডের বড় আকর্ষণ ক্যাসিনো। শহরটি জুয়াড়িদের খুব প্রিয়। বিশ্বের অনেক দেশ থেকেই তারা আসেন, খেলতে বসেন। ক্যাসিনো ক্লাবে সবার প্রবেশাধিকার আছে এবং খেলাও যায়। তবে অবশ্যই পাসপোর্ট থাকতে হবে। ক্লাবের ভেতরে ছবি তোলা যায়না। ক্যামেরা অভ্যর্থনা কক্ষে জমা রাখতে হয়। তারপর আপনি জুয়ায় জিতলে ম্যানেজার আপনাকে রিঙিত বুঝিয়ে দেবেন।

হাইল্যান্ডেসের চূড়ায় ঘুরলে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে চোখ ঝলসে যাবে। যখন আমরা আবাসিক হোটেল দুটির একটিতে প্রবেশ করছিলাম আকাশ ছিল পরিষ্কার। দূরের পাহাড়গুলো স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু আধা ঘণ্টা পরে এসেই সব চিত্র উল্টো। সাদা মেঘ হোটেলের চারপাশ আর পাহাড়ের ফাঁকা জায়গাকে গিলে খেয়েছে। আর ধোঁয়ার মতো উড়ছে আর খেলা করছে মেঘের ডানা।গেন্টিং হাইল্যান্ডের চূড়াও এর আশপাশে যত পাহাড় আছে সবগুলোকে সমন্বয় করে দেশটির সরকার গড়ে তুলেছে চমৎকার পর্যটন কেন্দ্র। হোটেল ম্যাক্সিমের ক্যাসিনোতে কাজ করা নিরাপত্ত্বা কর্মী জেকুইলিন জানালেন, দেশটির কেউ পর্যটন খাতে বিনিয়োগ করতে চাইলে নানা সুযোগ সুবিধা দিয়ে থাকেন। তাকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কিভাবে তিনি তার বিনিয়োগে পর্যটক আকর্ষণ করতে পারবেন তার পরামর্শ ও দেশটির পর্যটন খাত থেকে দেওয়া হয়।দেশটি স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে যতো শাসক এসেছেন তারা সকলেই পর্যটক আকর্ষণে মনোযোগী ছিলেন। নিয়েছিলেন যুগপযোগী নানা পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ। সেই কারণে খুব অল্প সময়ে কুয়ালালামপুর সিটিসহ দেশটির বিভিন্ন রাজ্যে পর্যটন খাতের বিকাশ লাভ করেছে বলে জানালেন গেন্টিং হাইল্যান্ডে পরিবার নিয়ে বেড়াতে আসা মালয়েশিয়ায় ২০ বছর ধরে বসবাসরত বাঙালি রেজোয়ান আহমেদ।

রেজোয়ান আহমেদ বলেন, ‘আমাদের (বাংলাদেশ) সরকার ও ইচ্ছা করলে দেশের বিভিন্ন পাহাড়কে কাজে লাগিয়ে পর্যটক আকর্ষণ করতে পারেন। এজন্য দরকার পরিকল্পনা ও ইচ্ছাশক্তি। ইচ্ছা শক্তি যে একটি দেশের পর্যটন আকর্ষণে অপার সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয় তার প্রমাণ কুয়ালালামপুরের পাহাড় বেষ্টিত পর্যটন কেন্দ্র পাহান।রেজোয়ান আহমেদের স্ত্রী ফারিয়া জাহান বলেন, ‘আমরা এখানে কতবার এসেছে তার হিসেব নেই। এমন লাখো পর্যটক মালয়েশিয়ায় আসেন শুধু এই ক্যাবল কারে চড়ে পাহাড় দেখার জন্য।’সময় ফুরিয়ে এলো। কিন্তু ইচ্ছে করছিল না ফিরে আসতে।

ওয়ানা স্টেশনের থাকা রেস্টুরেন্টে পযটকরা খাচ্ছেন

তারপর ও গাইড অ্যান্ডু'র ‘চাপে পড়ে’ সবাইকে দ্রুত পৌঁছাতে হলো যেখান থেকে আবার ও ক্যাবলে চড়তে হবে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সকলে একত্রিত হয়ে আবারও ক্যাবল কারে চেপে বসলাম। ক্যাবলকার পৌঁছলো সেই ওয়ানা স্টেশনে। স্টেশনে নামার পরই একটি রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার খেয়ে আবারও শুরু হলো বিশাল অজগরের মতো পাহাড়ি পথ ধরে হোটেলের পথে যাত্রা।

লেখক: দৈনিক সময়ের আলোর অপরাধবিষয়ক রিপোর্টার 

তারেক মোরতাজা— নেপথ্যের নায়ক
ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে করোনার ভ্যাকসিন শরীরে নিতে চান লোকমান

আপনার মতামত লিখুন