সোমবার, ০১ জুন ২০২০ | ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
মতামত

মানুষ এখন ঘুরে বেড়ায়

তৌফিক উদ্দিন আহমেদ
২১ জানুয়ারি ২০১৯
তৌফিক উদ্দিন আহমেদ

তৌফিক উদ্দিন আহমেদ

দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জায়গাগুলোতে বেড়ানোর হার বেড়েছে। রাঙামাটির সাজেক। ছবি: সংগৃহীতদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জায়গাগুলোতে বেড়ানোর হার বেড়েছে। রাঙামাটির সাজেক। ছবি: সংগৃহীতগত পাঁচ–ছয় বছরে হঠাৎ করে বেড়েছে বাংলাদেশের মানুষের বেড়ানোর হার। সেটা দেশের ভেতরে ও বাইরে—দুই অংশেই। দেশের ভেতরে মানে অভ্যন্তরীণ পর্যটন তো বেড়েছে ব্যাপক হারেই। আমরা যেটাকে বলি ‘ওভার ফ্লো’। যে কারণে আগামী ১ মার্চ থেকে সেন্ট মার্টিনে রাতে থাকা বন্ধ করতে যাচ্ছে সরকার। কারণ, প্রতিদিন গড়ে ১০–২০ হাজার পর্যটক এই দ্বীপে যাওয়ায় সেখানের পরিবেশ এখন হুমকির মুখে।

শুধু দেশের মধ্যে নয়, বিদেশে বেড়াতে যাওয়ার প্রবণতাও বেড়েছে বাংলাদেশিদের। বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলোতে। বাংলাদেশিদের মধ্যে বেড়ানোর জন্য দেশের বাইরে সবচেয়ে বেশি মানুষ যাচ্ছেন ভারতে। বছরে এ দেশ থেকে প্রায় ২০ লাখ মানুষ ভারতে বেড়াতে যান। এ ছাড়া থাইল্যান্ড, নেপাল, ভুটান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দুবাই ও মিসরে যাচ্ছেন অনেক মানুষ। ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের (ডব্লিউটিটিসি) তথ্যমতে, প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে ৩০ লাখের বেশি মানুষ দেশের বাইরে ঘুরতে যান।

বাংলাদেশিদের বেড়ানোর প্রবণতা বাড়লেও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়েনি বাংলাদেশে বেড়াতে আসা বিদেশি পর্যটকদের সংখ্যা, যেটা বাড়াতে পারলে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব বাংলাদেশের পর্যটনকে। বর্তমানে দেশের আয়ের প্রধান খাত যে তৈরি পোশাকশিল্প, সেটাকেও টেক্কা দিতে পারে পর্যটন। আয়ের বিকল্প এই খাতকে তাই আরও গুরুত্ব দিয়ে সাজানোর সময় এসেছে। শেষ কয়েক বছরে দেশে বিদেশি পর্যটকদের আনাগোনা নিয়মিতভাবেই বেড়েছে। তবে হঠাৎ সেখানে আঘাত হানে ২০১৬ সালের হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলা ও কাছাকাছি সময়ে বেশ কয়েকজন বিদেশি নাগরিককে হত্যা। এসব ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ফ্রান্সের মতো অনেক প্রভাবশালী দেশই তাদের জনগণকে বাংলাদেশে বেড়াতে আসার বিষয়ে রেড অ্যালার্ট দেয়। অনেক দেশই সম্প্রতি রেড অ্যালার্ট তুলে নিয়েছে, তবে এখনো ইয়েলো অ্যালার্ট চালু আছে। সরকারের উচিত এসব দেশের এম্বাসি পর্যায়ে যোগাযোগ করে আলোচনার মাধ্যমে দেশের নিরাপত্তার বিষয়টি বুঝিয়ে সব ধরনের নেগেটিভ অ্যালার্ট তুলে ফেলার ব্যবস্থা করা। তাহলেই বিদেশি পর্যটকেরা বাংলাদেশ সম্পর্কে আগ্রহী হবেন। কয়েক বছর আগের ‘বিউটিফুল বাংলাদেশ’ ক্যাম্পেইনের মতো নতুন নতুন প্রচারণা চালাতে হবে দেশ নিয়ে।

দেশের মধ্যে, এমনকি বিদেশে যেতেও ফেসবুকভিত্তিক নানা রকম ট্রাভেল গ্রুপ তৈরি হয়েছে, যেখানে পরিচিত, অপরিচিত বা স্বল্প পরিচিতরা দল বেঁধে ঘুরতে যাচ্ছে।আমাদের দেশে এত মিশ্র সংস্কৃতির (মাল্টি কালচার) লোকজনের বসবাস যে সহজেই পর্যটককে আকর্ষণ করা যাবে। তবে দরকার যথাযথ প্রচার।
শেষ তিন বছরে ডোমেস্টিক ট্যুরিজম (দেশের মানুষের দেশে ঘোরা) বেড়েছে ৪০ শতাংশ। আর এই ভ্রমণপিপাসুদের একটা বড় অংশ দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি। একটা সময় আমাদের দেশের উচ্চবিত্তরাই শুধু বেড়াতেন। বেড়ানোর মৌসুম মানেই ছিল শীতকাল। সন্তানদের স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ করে বেড়ানোর পরিকল্পনা করতেন মা–বাবা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে বেড়ানোর সেই রীতি। এখন সারা বছরই বেড়ানোর মৌসুম। দুই দিনের ছুটি পেলেও মানুষ ছুটছে দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন স্পট। দেশের মধ্যে এখনো মানুষ সবচেয়ে বেশি বেড়াতে যায় কক্সবাজার। এরপর সুন্দরবন, চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকা, সিলেট ও শ্রীমঙ্গল। দেশের যোগাযোগব্যবস্থা ভালো হচ্ছে বলেই মানুষ দুই দিনের ছুটিতে বেড়াতে যাওয়ার সাহস দেখাচ্ছে। তবে যোগাযোগ ভালো করার পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য ভালো থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে। এখানে পাহাড়পুর, মহাস্থানগড়, কান্তজিউ মন্দির, সমতল চা–বাগানসহ নানা ধরনের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আছে। তবে অধিকাংশ এলাকায় থাকার জন্য ভালো হোটেল নেই। স্পটের আশপাশের মানুষগুলোকে যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়াটাও জরুরি।

বাংলাদেশে সাধারণত তিন ধরনের ট্যুরিজম হয়। সেই ধরনগুলো হচ্ছে ১. ডোমেস্টিক ট্যুরিজম (দেশের মানুষ দেশের মধ্যে ঘোরা)। ২. আউট বাউন্ড ট্যুরিজম (দেশের মানুষের বিদেশে বেড়াতে যাওয়া) এবং ৩. ইন বাউন্ড ট্যুরিজম (বিদেশি পর্যটকের দেশে বেড়াতে আসা)।

দেশের মধ্যবিত্ত মানুষের হাতেও এখন আগের চেয়ে বেশি টাকা। তা ছাড়া বাংলাদেশের মানুষের জীবনযাপনে নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে ঘোরাঘুরির বিষয়টা। আগে যেটা ছিল কম। কাছের মানুষদের সময় দেওয়া, প্রিয়জনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করা বা নিজের মনকে প্রফুল্ল রাখতে বেড়াতে যাওয়ার মতো দাওয়াই আর নেই। বাড়তি ছুটি না পেলেও বেড়াতে যাচ্ছেন। কিছুই না হোক, ঢাকার কাছেপিঠে ৫০ কিলোমিটারের মধ্যে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, মুন্সিগঞ্জের কোনো রিসোর্টে চলে যাচ্ছেন উইকএন্ডে। শুক্র, শনিবার কাটিয়ে রোববার কাজে যোগ দিচ্ছেন চাঙা হয়ে। শুধু গাজীপুরেই বর্তমানে প্রায় ৫০টি রিসোর্ট আছে, যার মধ্যে আছে বেশ কয়েকটি পাঁচ তারকা রিসোর্টও। এ ছাড়া সারা দেশের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় গড়ে উঠেছে আধুনিক সুযোগ–সুবিধাসহ রিসোর্ট। রিসোর্টগুলোর জমির পরিমাণ ১০ থেকে ১০০ বিঘা পর্যন্ত। লোকজন সেখানে যাচ্ছেন, থাকছেন, সময় কাটাচ্ছেন। তাঁদের বেড়ানোর কাজটি সহজ করতে দেশে ট্রাভেল এজেন্সি তৈরি হয়েছে বেশ কিছু বছর আগেই। এসব ট্রাভেল এজেন্সির কিছু প্রতিষ্ঠান মিলে ১৯৯২ সালে জন্ম নেয় ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টোয়াব)। তবে টোয়াব বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের স্বীকৃতি পায় ২০০২ সালে। বর্তমানে টোয়াবের সদস্যসংখ্যা পাঁচ শতাধিক। এর বাইরেও প্রায় ১ হাজার ট্রাভেল এজেন্সি আছে দেশে। সবই বেড়েছে সময়ের চাহিদার সঙ্গে। এ ছাড়া দেশের মধ্যে, এমনকি বিদেশে যেতেও ফেসবুকভিত্তিক নানা রকম ট্রাভেল গ্রুপ তৈরি হয়েছে, যেখানে পরিচিত, অপরিচিত বা স্বল্প পরিচিতরা দল বেঁধে ঘুরতে যাচ্ছে। গত তিন–চার বছরে ফেসবুকভিত্তিক এসব দলের প্রসার দেখা যাচ্ছে। এতে খরচটাও কমে আসে। এই ধরনের দলে বেশি দেখা যাচ্ছে তরুণ ছেলেমেয়েদের। শিক্ষার্থী বা সবে কর্মজীবনে প্রবেশ করেছেন, এমন ছেলেমেয়েরা বেড়াতে যাচ্ছেন নিয়মিত। প্রতি মৌসুমে (নভেম্বর–মার্চ) বর্তমানে সেন্ট মার্টিন যায় প্রতিদিন গড়ে ৮–১০টি জাহাজ, সুন্দরবনে (অক্টোবর–মার্চ) যায় ১০–১৫টি জাহাজ। বিমানে প্রতিদিন ১০–১২টি ফ্লাইট থাকে ঢাকা থেকে কক্সবাজারের উদ্দেশে। এ ছাড়া বাস, ট্রেন আর ব্যক্তিগত পরিবহন তো আছেই। সব মিলিয়ে ঘোরাঘুরিতে একটা বিপ্লব ঘটে গেছে বছর দশেকের মধ্যে। এখন প্রয়োজন এই ধারাকে ধরে রাখা। এ ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগ দরকারি। যথাযথ গবেষণা করে বাংলাদেশের ট্যুরিজম সেক্টরকে আরও আধুনিকায়ন করতে হবে। কৃত্রিম আয়োজনের চেয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশে বেড়াতে ভালোবাসেন পর্যটকেরা, যেটা আমাদের বাড়তি সুবিধা দেবে।

তৌফিক উদ্দিন আহমেদ : ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি

মুসলিম বিশ্বের আকর্ষণীয় কয়েকটি পর্যটনকেন্দ্র
কক্সবাজারের পর্যটন : সবকিছু থেকেও যেন নেই

আপনার মতামত লিখুন