মঙ্গলবার, ২২ জুন ২০২১ | ৮ আষাঢ় ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
মতামত

রনাঙ্গনের কিশোর মুক্তিযোদ্ধা বলছি

ড. মো. ফরজ আলী
২৭ নভেম্বর ২০২০
ড. মো. ফরজ আলী

ড. মো. ফরজ আলী

মার্চ ২৬, ১৯৭১ সাল। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দিয়েছেন। স্বাধীন দেশ চাই, আর পাকিস্তানিদের দাসত্ব করতে চাই না। শহর, বন্দর, গ্রামে একই ধ্বনি, প্রতিধ্বনি, ‘বীর বাঙ্গালি অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর।’ স্বাধীনতা সংগ্রামে দেশ উত্তাল। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সশস্ত্র সাজে সজ্জিত হয়ে নিরীহ বাঙ্গালিদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। নারী, পুরুষ, শিশু কেহই তাদের আক্রমন থেকে রেহাই পাচ্ছে না। নির্বিচারে সকলের উপর গুলি চলছে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে রেডিওতে দেশব্যাপী হত্যাযজ্ঞ, জ্বালাও পোড়াও, নারী নির্যাতন ও লুটতরাজের খবর সার্বক্ষনিক প্রচার হচ্ছে। এ ঘৃন্যতম আক্রমনের দাত ভাঙ্গা জবাব দিতে এবং দেশকে স্বাধীন করতে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় অঘোষিত বন্ধ। সময় অতিক্রান্তের ব্যবধানে টগবগে ছেলেরা যুদ্ধের ট্রেনিং গ্রহণের জন্য দলে দলে ভারতে যাচ্ছে। আবার ট্রেনিং শেষে দেশে প্রবেশ করে বিচ্ছিন্নভাবে শত্রু মোকাবেলা করছে। তাদের কাছেও গোপনে গোপনে দেশের দুরন্ত ছেলেরা যুদ্ধের ট্রেনিং নিচ্ছে। পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর গনহত্যা, লুন্ঠন ও মা বোনের সম্ভ্রমহরনের চিত্র বিবেকবান মানুষকে বিচলিত করত। তাই প্রতিশোধ। এই প্রতিশোধ নেওয়ার প্রত্যয় থেকে মুক্তিযুদ্ধে যেতে উদ্ভুদ্ধ হয়েছিলাম। যুদ্ধ ক্ষেত্রে আমিও যে মৃত্যুর সম্মুখীন হতে পারি এরূপ ধারনা বা যুদ্ধের ভয়াবহতা উপলব্ধি করার যথেষ্ট জ্ঞান তখনও হয়নি। মুক্তিযোদ্ধাদের উপস্থিতি এবং মাঝে মধ্যেই হানাদার বাহীনীর উপর অর্তকিত আক্্রমন, তাদের অদৃশ্য শক্তি প্রদর্শন সাধারন মানুষকে উজ্জীবিত করত এবং মুক্তিযুদ্ধে যেতে বিপুল উৎসাহ যোগান দিতো। 

সবেমাত্র ৭ম শ্রেণি পেরিয়ে ৮ম শ্রেণীতে প্রবেশ করেছি। বয়স ১৩-১৪ বছর । হালকা পাতলা গড়ন। বয়স ও শারিরীক গঠন এর কারনে কেহই আমাকে যুদ্ধে যাওয়ার উৎসাহ দিতেন না। কিন্তু আমি নাছোড় বান্দা। যুদ্ধে যেতেই হবে। যুদ্ধের প্রাক-প্রস্তুতি হিসেবে অস্ত্রের ট্রেনিং নেওয়া অপরিহার্য। পার্শ্ববর্তী বন্ধুরাষ্ট্র ভারত ট্রেনিং প্রদানে সর্বাত্নক সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে। নৌকা ভাড়া করে দলে দলে ভারতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি ও দলে অন্তর্ভূক্তির জন্য গোপনে তালিকা করা হচ্ছে। কোনক্রমেই তালিকাভূক্ত হতে পারছিনা। যেখানেই যাচ্ছি একই কথা আমার যুদ্ধে যাওয়ার বয়স হয়নি। বয়সের ঝুকিঁ মনে করে কেহই আমাকে সঙ্গে নিতে চায়নি। মামা ও গ্রামের কয়েকজন কলেজ ছাত্র মিলে ভারতে যাওয়ার জন্য একটি দলগঠন করলো। লুকিয়ে লুকিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে থাকলাম। কখন কোন নৌকায় রওনা হয়। সময়টা ছিল জুলাই-আগষ্ট, ১৯৭১। দলটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে নৌকা পথে মানকিয়ার চর বর্ডার হয়ে ভারতে প্রবেশ করবে। ইতোমধ্যে বড় একটা নৌকাও ভাড়া হয়ে গেছে। যারা নৌকার সাথে বিশেষ ভাবে পরিচিত অর্থাৎ যারা নদ নদী বেষ্টিত এলাকায় বসবাস করেন, নদীপথে প্রতিনিয়ত যাতায়াত করেন তারা বড় নৌকার গঠন সম্পর্কে অবশ্যই অবগত আছেন। নৌকার পিছনের অংশে পাটাতনের নীচে বিশাল খালি জায়গা। আমার মত ছোট আকারের দেহ সহজেই পাটতানের নীচে লুকিয়ে রাখা যায়। দুপুর ১২টার দিকে নৌকা পাল তুললো। সকলের চোখে ধূলো দিয়ে নৌকার পাটতানের নিচে অবস্থান করে আমিও রওনা হলাম মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার স্বপ  বাস্তবায়নে ভারতের উদ্দেশ্যে। প্রবল বাতাসে নৌকা ঝড়ের বেগে চলছে। তখনও কেউ জানতে পারিনি আমার সুচতুরতা ও মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার কৌশল। নদী পথে ভারতে অসংখ্য বাঙ্গালি পাড়ি জমাচ্ছে যা পাকিস্তানি আর্মিরা ইতোমধ্যে আঁচ করতে পেরেছে। ফলে নদী পথ সে মূহূর্তে অত্যন্ত ঝূঁকিপূর্ণ ছিল। বাহাদুরাবাদ ঘাট যেন মরন ফাঁদ। এ স্থান অতিক্রম করতে গিয়ে অনেকেরই সলিল সমাধি হয়েছে। পাকিস্তানি আর্মিরা এখান থেকে সার্চ লাইটের মাধ্যমে নৌকার গতিপথ পর্যবেক্ষণ করতো। সন্দেহ হলে গুলি করে নৌকা নদিতে ডুবিয়ে দিত। কখনও কখনও নৌকা ধরে তীরে আনতো এবং মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিতে ভারতে যাচ্ছে সন্দেহে নৌকার আরোহীদের ব্রাশ ফায়ার করে মুত্যু কুপে নিক্ষেপ করতো। সুতরাং এ অংশটি অতিক্রম করতে পারলে ধরে নেওয়া হতো জীবন বাঁচলো তৎসংগে ভারতে প্রবেশ করাও নিশ্চিত হলো। রাত্রি প্রায় ৩.০০টা। হঠাৎ আল্লাহ আকবর ধ্বনি। বুঝতে পারলাম বাহাদুরাবাদ ঘাট অতিক্রান্ত  হয়েছে। সকলেই জীবন রক্ষা করতে পেরেছি। দীর্ঘ সময় পাটাতনের নীচে নিজেকে কুচকে রাখার বেদনার অবসান ঘটিয়ে বীরদর্পে আমিও পাটাতনের উপরে উঠে আল্লাহ আকবর ধ্বনি দিলাম। সকলেই অবাক, আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করলো আমি কিভাবে তাদের সাথী হলাম। কেউ কেউ আমার মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার এহেন কৌশল চমৎকার বলে প্রশংসা করলেও মামা খুব মন খারাপ করলেন। কারণ যুদ্ধ করার জন্য আমার শারীরিক যোগ্যতা সম্পর্কে মামা খুবই সন্ধিহান ছিলেন। কিন্তু আফসোস, পিছু হটার আর কোন সুযোগ ছিল না। অল্প সময়ের মধ্যে পৌছে গেলাম মানকিয়ার চর বর্ডারে। বাংলাদেশের সাথে ভারতের আসাম রাজ্যের মানকিয়ার চর বর্ডার। শুধু মানুষ আর মানুষ। বাংলাদেশ থেকে দলে দলে হিন্দু শরনার্থীরা এখানে এসে জনসংখ্যা বাড়িয়ে দিয়েছে। রাস্তার দু’পাশে তাবুর মধ্যে তাদের বসবাস। বৃষ্টিতে তাবুর ভিতর কাঁদা পানি, বসবাসের একেবারেই অযোগ্য। তার মধ্যে গাদাগাদি হয়ে শরনার্থীদের বসবাস। সে যে কি করুন দৃশ্য তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না শুধু অনুভব করা যায়। আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো মরনটিলা / ময়নটিলা ক্যাম্পে। মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং গ্রহণের যোগ্যতা নির্ধারনে এটি প্রাথমিক যাচাই বাচাইয়ের স্থান। টিলার উচ্চত এতো বেশী যে, একবার সমতলে নামলে উপরে উঠার সাহস হারিয়ে যায়। যাচাই বাচাই এর সময় আবার একই বিপত্তি। আমাকে নিয়ে টানাটানি। এতো অল্প বয়স এবং হালকা, পাতলা শরীর নিয়ে যুদ্ধ করার সক্ষমতা নেই মর্মে বিচারকদের ধারণা। বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো অসম্ভব বিবেচনায় দলের সকলের অনুরোধের প্রেক্ষিতে ভাগ্য সুপ্রসনড়ব হলো। হুকুম হলো, ভারতের দার্জিলিং জেলার শিলিগুড়িস্থ পানিঘাটা ট্রেনিং ক্যাম্পে ট্রেনিংয়ে যাওয়ার জন্য। কখনও স্থলপথে বাস/ ট্রাক আবার কখনও জলপথে লঞ্চ/স্টিমারে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে উপস্থিত হলাম পানি ঘাটা ট্রেনিং ক্যাম্পে। প্রশিক্ষনের ক্যাম্পটি ছিল ৭নং সেক্টরের আওয়াতাধীন। ক্যাম্পে সারিবদ্ধভাবে তাবু নির্মাণ করা হয়েছে। এক তাবুতে ০৫/০৭ (পাঁচ/সাত) জনের থাকার ব্যবস্থা। তাবুর মধ্যে মাটিতে খেজুরের পাটি তার উপর কম্বল এর বিছানা। কয়েকটি কোম্পানীতে বিভক্ত করে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষন দেওয়া হচ্ছে। এ্যালফ্যাবিটিক্যাল অর্ডারে কোম্পানীর (আর্মিদের প্লাটুন, কোম্পানী থাকে) নামকরণ করা হয়েছে। যেমন এ কোম্পানীকে ‘আলফা’ ‘বি’ কোম্পানীকে ‘বেটা’ ‘সি’ কোম্পানীকে ‘চার্লি’ ইত্যাদি। আমি অন্তর্ভূক্ত হলাম‘এল’ বা ‘লিমা’ কোম্পানীতে। কোম্পানীর বরাদ্দ পেয়ে লাইনে দাড়ালাম। প্রত্যেককে দেওয়া হলো দুটি গেঞ্জি, দুটি হাফপ্যান্ট, দুটি গামছা অর্থাৎ জোড়া জোড়া প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। এ জিনিসগুলো বিভিনড়ব দেশ থেকে পাঠানো অসম আকৃতির। গেঞ্জি পরিধান করলে কাধ থেকে হাটু পর্যন্ত বিস্তৃত হতো। হাফপ্যান্ট এরএক পা পথেই আমার দু’পা চলে যেতো। ভ্যাগিস, গামছা ছিল। হাফপ্যান্টের হুকের মধ্যে গামছা ঢুকিয়ে কোমর বেধে রাখতাম আর হাফপ্যান্টের নিচের অংশ গিয়ে পায়ের গোঁড়ালি ছুই ছুই করতো। হাফ প্যান্ট পরিধান করলে পোষাকের যে সৌন্দর্য্য দৃশ্যমান হতো তা শুধু আদিম যুগের পোশাকের সাথে মিলানো যায়। ক্যাম্পটি কাটাতারের মজবুত বেড়া দ্বারা বেষ্ঠিত জনবসতিহীন পাহাড়ি এলাকা। ভারত বিরোধী কিছু দুঃষ্কৃতিকারি লোকদের পাহাড়ের পাদদেশে লুকিয়ে থাকার একধরণের আশ্রয়স্থল। এক পাশ দিয়ে পাহাড় থেকে লেক প্রবাহিত হচ্ছে। লেকের ওপারে বন্য প্রাণীর আবাসস্থল। হিংস্র বন্য প্রাণী এবং দুষ্কৃতকারীদের যৌথ আমন্ত্রণে এলাকাটিতে বসবাস ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অতি সাবধানতা অবলম্বন করেও কতিপয় ট্রেনিং প্রত্যাশী ব্যক্তির জীবন ছিনিয়ে নিয়েছে প্রাণ হননকারী মানব প্রাণী মহাজোট। দল ছাড়া একা চলাফেরা নিরাপদ নয় বিধায় ক্যাম্পের বাহিরে একা যাওয়া নিষেধ ছিল। ক্যাম্পে খাওয়া দাওয়ার আইটেম ছিল অদ্ভুত। মাছ না অন্য কিছু, মাংস, তা কিসের মাংস বুঝতাম না। অন্যদেশের সাহায্য যা আসতো সেটাই খেতে দিতো। সেটা হালাল না হারাম জিজ্ঞাসা করার সুযোগ ছিল না। তবে নির্ভেজাল এবং তাজা চা পাতার ঘ্রাণ এখনও ভোলা যায় না। সুস্বাদ চা ই মূলতঃ ক্ষুধা নিভৃত করতো। পিছনে হাফ লিটারের একটি মগ সব সময় বাধা থাকতো। ৩/৪ ঘন্টা পর পর চা পান করতাম। তার স্বাদ একমাত্র অমৃত সুধার সাথে তুলনা করা যায়। খুব স্বল্প সময় নাস্তা এবং দুপুরের খাবারের জন্য বরাদ্দ থাকতো। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খাবার শেষ করতে না পারলে না খেয়েই ট্রেনিংএ উপস্থিত হতে হতো। সকাল ৭টা থেকে রাত ৮ পর্যন্ত ট্রেনিং চলতো (নাস্তা ও দুপুরের খাওয়া বাদে)। ট্রেনিং শুরু হতো পিটি দিয়ে। একেক দিন একেক রকম পিটি হতো। এর মধ্য বল খেলা ছিল অন্যতম। ক্যাম্প থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে বিরাট মাঠ। প্রতি পক্ষে ১০০ জন করে খেলোয়াড়। হাত দিয়ে হউক আর পা দিয়ে হউক গোল দেওয়া চাই। যে দল হারবে তাহাদের প্রত্যেককে শাস্তি স্বরূপ বিজয়ী দলের একজনকে কাধে করে ক্যাম্পে নিয়ে যেতে হতো। মজার বিষয় ছিল, শারীরিক গঠন পাতলা এবং ছোট হওয়ার কারনে জিতিই বা হারি প্রতিবারই অন্যের কাধেঁ উঠে ক্যাম্পে যেতাম। পর্যবেক্ষকরা লক্ষ্য করতেন একজনের কাঁধে অন্য আরেক জন আছে কিনা। তারপর নাস্তা খেয়ে দৌড় দিতাম প্রাকটিক্যাল ট্রেনিং এর জন্য। ভারতের অভিজ্ঞ ও হিংস্র প্রকৃতির শিখ ও গারো সৈনিকেরা ট্রেনিং প্রশিক্ষক ছিলেন। তাদেরকে আমরা ওস্তাদ বলে সম্বোধন করতাম। রাইফেল, এসএমজি (স্টেনগান) এলএমজি এবং অন্যন্য সমমানের অস্ত্র সম্পর্কে বাস্তব এবং তাত্ত্বিক ট্রেনিং হতো। রাত্রের অন্ধকারে অস্ত্রের যন্ত্রাংশ খুলে আবার অস্ত্রকে সরিয় করার ট্রেনিং সত্যি অনেক জটিল ছিল। মাইন, গ্রেনেড, এক্সপ্লোসিভ ইত্যাদি ব্যবহারের যথাযথ জ্ঞান অর্জনে রীতিমত ক্লাস করতে হতো। উল্লেখ করা যায়, সে সময়ে পাকিস্তানী আর্মি বিশ্বের মধ্যে একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী বলে সুপরিচিত ছিল। স্বল্প সময় ট্রেনিং প্রাপ্ত হয়ে দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞ পাকিস্তানি আর্মিদের চ্যালেঞ্জ দেওয়া এবং যুদ্ধের ভয়াবহতা মোকাবেলা করা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অবশ্যই হীম্মতের বিষয় ছিল। প্রশিক্ষকরা বেশীরভাগ হিন্দি ভাষায় কথা বলতো। স্বল্প পরিমাণ ইংরেজির ব্যবহার ছিল। প্রথম দিকে হিন্দি ভাষা বুঝতে না পারার কারণে উল্টাপাল্টা কাজ করতাম। এ জন্য মাশুলও কম দিতে হয়নি। ওস্তাদদের চড়-থাপ্পর লাথি লেগেই থাকতো। পরে অবশ্য হিন্দি ভাষা বুঝতে পারা এবং বলা দুটোতেই পারদর্শী হয়েছিলাম। ভাষা বুঝতে সহায়তা দেওয়ার জন্য প্রতি কোম্পানীতেই পূর্ব অভিজ্ঞ একজন ট্রেইন্ড বাঙ্গালি ওস্তাদ থাকতো যিনি হিন্দি ভাষাকে বাংলায় অনুবাদ করার দায়িত্বে থাকতেন। প্রশিক্ষণ চলাকালে হিন্দি কথপকথনের বিপরীতে বাঙ্গালি ওস্তাদ যেভাবে বলতেন সেভাবেই আমরা রেসপন্ড করতাম। তাদেরকে ইন্টারপ্রিটার বলা হতো। মজার বিষয় একদিন হঠাৎ এক বাঙ্গালি ইন্টারপ্রিটারকে দেখলাম কান ধরে বার বার উঠবস করছেন। তারপর বুকডন ও ক্রোলিং। আমরা সকলে বিস্মিত ! ব্যাপার কি? পরে জানতে পারলাম প্রশিক্ষক যা বলেছেন বাঙ্গালি ইন্টারপ্রিটার ভুল অনুবাদ করায় আমরা অন্যভাবে রেসপন্ড করেছি ফলে শাস্তিটা তাকেই দেওয়া হয়েছিল। অল্প বয়স হওয়ার কারনে ওস্তাদদের থেকে কোন অনুকম্পা পেতাম না। সকলের মতো ট্রেনিং এ পারদর্শী না দেখাতে পারলে নেমে আসতো চরম শাস্তি। মনে হতো শাস্তিটা ট্রেনিং এর একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। সপ্তাহের একদিন ছুটি থাকলেও ঐ দিন ব্যস্ত রাখতো লেক থেকে বালির বস্তা ওপরে টানাটানির মাধ্যমে। অবশেষে ট্রেনিং সমাপ্ত। প্রত্যেকের জন্য বরাদ্দ হলো ফ্রিডম ফাইটার নাম্বার (এফ এফ নং)। রওনা হলাম তরঙ্গপুর ক্যান্টনমেন্টের উদ্দেশ্যে যেখান থেকে আমাদের প্রত্যেকের নামে অস্ত্রের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। তরঙ্গপুর ক্যান্টরম্যান্টে অবস্থানকালে কিছু অভিজ্ঞতা এবং ঘটনার উল্লেখ না করলেই নয়। এখানে অনেক মুক্তিযোদ্ধার উপস্থিতির কারনে প্রয়োজনীয় খাবার, খাবার বাসন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ অপ্রতুল ছিল। খাওয়ার বাসন হিসেবে ব্যবহৃত হতো কলাপাতা। তার স্বল্পতায় ব্যবহৃত হতো কলাগাছের ডোঙ্গা (কলাপাতা নয়)। কিছু দিনের অবস্থানে আশে পাশের কলাগাছের অনুপস্থিতি পরিলক্ষিত হয়েছিল। বাসন হিসেবে আনা হলো আখের রস জ্বাল করার কড়াই। কড়াইয়ের মধ্যে ২০/২৫ জনের ভাত ও তরকারি মিশিয়ে রাখা হতো। কড়াইয়ের চারিপাশে পা রাখার জায়গা খালি থাকতো। আমরা কড়াইয়ের মধ্যে উঠে খাওয়া শুরু করতাম। খাওয়া শেষ হলে নেমে আসতাম এবং একইভাবে বাকীরা অবশিষ্ট খাবার খেতো। কয়েকদিনের মধ্যে তরঙ্গপুরে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধাদের আহাজারি উপলব্ধি করলাম। বর্ডারে যুদ্ধ চলছে। ভারতীয় বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের সামনে রেখে যুদ্ধ পরিচালনা করতেন। আর পাকিস্তানি বাহীনির এম্বুশের আওতায় কত মুক্তিযোদ্ধা যে প্রাণ হারিয়েছে তা মনে হলে এখনও গা শিউরিয়ে উঠে। আমাদেরকে অবশ্য বর্ডারে যুদ্ধ করতে যেতে হয়নি। পাকিস্তানি বাহিনীকে মোকাবেলা করার প্রয়োজনে দ্রুত দেশের অভ্যন্তরে আসতে হয়েছে। মানকিয়ার চর হয়ে নদীপথে আবার নিজ জেলা সিরাজগঞ্জে। থাকার জন্য প্রথম আস্তানা হলো যোগাযোগবিহীন একটি চর এলাকায়। রাত্রি যাপন করতাম কখনও গোয়ালঘরে খড় বিছিয়ে কখনও খোদ গৃহস্থলীর শোয়ার ঘরে। মূহুর্ত মূহুর্ত স্থান বদল করতাম যাতে শত্রু বাহিনী আমাদের অবস্থান জানতে না পারে। এতটুকু সতর্কতা অবলম্বন করার পরও রাজাকার আল বদরের সহযোগীতায় পাকিস্তানি বিমানবাহিনী আমাদের নৌকা লক্ষ্য করে গুলি বর্ষণ করে। লক্ষ্য ভ্রষ্টের কারণে সে যাত্রা আমরা বেঁচে যাই। নভেম্বর মাস, পরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা তিনটি দলে বিভক্ত হয়ে তিন দিক থেকে সিরাজগঞ্জ জেলার কাজীপুর থানা সদরে অবস্থানরত পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে আক্রমণ করি। আমরা থানার পশ্চিম দিক থেকে গ্রুপ কমান্ডার মোঃ আব্দুস সাত্তারের নেতৃতে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করি। সকল গ্রুপের সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিল মোঃ লুৎফর রহমান (মৃত)। জনাব সাত্তার অত্যন্ত সাহসী বটে, তার সিদ্ধান্ত গ্রহন কখন কখনও অতি সাহসিকতার পরিচয় বহন করতো। আমরা খোলা মাঠে অবস্থান নিয়ে ক্রলিং করে গুলি ছুড়তে ছুড়তে সমুখে অগ্রসর হতে থাকি। সংরক্ষিত বাংকার থেকে পাক বাহিনী আমাদেরকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে থাকে। এতে সহযোদ্ধা চাঁন মিয়া নিহত এবং মোঃ আমজাদ হোসেন ও আবুল কাসেম (মৃত) গুলিবিদ্ধ হয়। সারাদিনব্যাপি যুদ্ধ চলমান থাকায় প্রয়োজনীয় গোলাবারুদের সল্পতা দেখা যায় ফলে শেষ চেষ্টা করেও থানা দখল মুক্ত করা সম্ভব হয়নি। সুরক্ষিত বাঙ্কারে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অবস্থানের কারণে যুদ্ধে ততটা সফলতা না আসলেও পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী বুঝতে পারে মুক্তিযোদ্ধারা তাদের ঘিরে ফেলেছে। তারা মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং পরবর্তী সময়ে বিশেষ পাহাড়ায় পর্যায়ক্রমে জেলা সদরে পালিয়ে যায়। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সিরাজগঞ্জ শহরের অদূরে শৈলমারী- ভাটপিয়ার নামক স্থানে আরও একটি ভয়াবহ যুদ্ধে অবতীর্ন হই। এখানেও সকাল থেকে যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধে প্রাণ যায় সোহরাব সহ কয়েকজন সহযোদ্ধার। উল্লেখ্য জনাব আমির হোসেন ভুলু (মৃত) সে সময় সিরাজগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের অধিনায়ক ছিলেন। ১৪, ডিসেম্বর কোন সংঘাত ব্যতিরেকে সিরাজগঞ্জ শহর শত্রু মুক্ত হয়। দীর্ঘ সংগ্রাম ও নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর আসে ১৬, ডিসেম্বর ১৯৭১। সকলের বাঁধ ভাঙ্গা আনন্দ। তবে এ আনন্দ অর্জিত হয় লাখ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে আর এর সাথেই সমাপ্ত ঘটে মহান মুক্তিযুদ্ধের। পৃথিবীর বুকে প্রতিষ্ঠিত হয় একটি স্বাধীন স্বার্বভৌম দেশ, লাল সবুজের বাংলাদেশ। বিজয় পরবর্তী কিছুদিন কাটলো জেলা সদরের মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে সহযোদ্ধাদের সাথে। অতঃপর বাংলাদেশ ও ভারতের তত্বাবধানে পরিচালিত যৌথ বাহিনীর নিকট সিরাজগঞ্জ ম্যালেশিয়া ক্যাম্পে অস্ত্র জমা দিয়ে রওনা হলাম বাড়ীর উদ্দেশ্যে। বিদায় লগেড়ব সহযোদ্ধা এস এম তরিকুল ইসলাম, আবদুর রশীদ, আমজাদ হোসেন, সুজাবত আলী, আমিরুল, হাবিবুর, ওহাব, তোফাজ্জেল সহ অনেকের চোখ ছল ছল করছিল। একই গ্রামের অধিবাসী ও সহযোদ্ধা আব্দুস সামাদ, আবুল কাসেম, আজিজুর ও মামা সামসুল হক এক যোগে বাড়ি পৌছে গেলাম। শুধু বাড়ীর লোকই নয় গ্রামের অনেক লোকই আমাকে দেখতে আসলো, আদর করল আর প্রশংসা করলো আমার কিশোর বয়সের সাহসিকতা ও বীরত্বের।  জীবনের শেষ লগ্নে উপনীত হয়ে স¦রন করছি সহযোদ্ধাদের। তাদের মধ্যে জানা অজানা অনেকই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। হাজার বছরের শেষ্ঠ বাঙ্গালী, বঙ্গবন্ধু ও জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে সমগ্র জাতি ঝাপিয়ে পড়েছিল মুক্তি যুদ্ধে, দেশের সাত (০৭) কোটি মানুষই ছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি। স্বাধীনতা এসেছে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে। এদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস বাঙ্গালীর গৌরব ও বিরত্বের ইতিহাস, এ ইতিহাস ত্রিশ (৩০) লক্ষ শহীদের আতড়বত্যাগের ইতিহাস, এ ইতিহাস লক্ষ লক্ষ মা-বোনদের ইজ্জত/সম্ভ্রম হারানোর ইতিহাস, এ ইতিহাস পৃথিবীর বুকে বাঙ্গালীর মাথা উচু করে কথা বলার অধিকার আদায়ের ইতিহাস, এ ইতিহাস বাঙ্গালীর বাক স্বাধীনতা প্রকাশের ইতিহাস এবং এ ইতিহাস বঙ্গবন্ধুর স্বপেড়বর সোনার বাংলা গড়ার ইতিহাস যা ইতোমধ্যেই তার সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাস্তবে রূপ দিতে চলেছেন। জয় হোক মুক্তিযুদ্ধের, জয় হোক বাঙ্গালী জাতীর, জয় হোক বাংলাদেশের। মুক্তিযোদ্ধার পরিচিতি:- 

১. মোঃ ফরজ আলী 

এফ এফ নং-৮১৮৫ ৭নং সেক্টর বহি (৭নং সেক্টর ভলিউম) ৭৯ নং পাতায় ৪,৬৯২ নং ক্রমিকে নাম লিপিবদ্ধ আছে; মুক্তি বার্তা নং-০৩১২০৬০৪৫৬; সাপ্তাহিক মুক্তিবার্তা, ৪র্থ বর্ষ-২৭তম সংখ্যা তাং ০৭/০৬/২০০১, পৃষ্ঠা নং-৭৮ এ নাম লিপিবদ্ধ আছে; মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রনালয়- সাময়িক সনদ পত্র নং ম-০০০০০৭ তাং-১৫-০৫-২০০২ ইং, জেলা-সিরাজগঞ্জ, থানা-কাজিপুর; গেজেট নং-২৭৮৮ প্রকাশিত-বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ০১, ২০০৫, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রনালয়, প্রজ্ঞাপন-তারিখ সেপ্টেম্বর ০৪, ২০০৩ ইং । 

২. ড. মোঃ ফরজ আলী 

সংশোধিত গেজেট জানুয়ারী ০৬, ২০১৪ পৃষ্ঠা নং ১৭১, গেজেট নং-২৭৮৮ (‘ড.’ সংযোজন করে ড. মো: ফরজ আলী নাম লিপিবদ্ধ করা হয়েছে)।

মুক্তিযোদ্ধার পরিচিতি:- 

১. মোঃ ফরজ আলী 

এফ এফ নং-৮১৮৫ ৭নং সেক্টর বহি (৭নং সেক্টর ভলিউম) ৭৯ নং পাতায় ৪,৬৯২ নং ক্রমিকে নাম লিপিবদ্ধ আছে; মুক্তি বার্তা নং-০৩১২০৬০৪৫৬; সাপ্তাহিক মুক্তিবার্তা, ৪র্থ বর্ষ-২৭তম সংখ্যা তাং ০৭/০৬/২০০১, পৃষ্ঠা নং-৭৮ এ নাম লিপিবদ্ধ আছে; মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রনালয়- সাময়িক সনদ পত্র নং ম-০০০০০৭ তাং-১৫-০৫-২০০২ ইং, জেলা-সিরাজগঞ্জ, থানা-কাজিপুর; গেজেট নং-২৭৮৮ প্রকাশিত-বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ০১, ২০০৫, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রনালয়, প্রজ্ঞাপন-তারিখ সেপ্টেম্বর ০৪, ২০০৩ ইং । 

২. ড. মোঃ ফরজ আলী 

সংশোধিত গেজেট জানুয়ারী ০৬, ২০১৪ পৃষ্ঠা নং ১৭১, গেজেট নং-২৭৮৮ (‘ড.’ সংযোজন করে ড. মো: ফরজ আলী নাম লিপিবদ্ধ করা হয়েছে)।

লেখক: পরিচালক, অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেড

ই-মেইল: [email protected]  

সুবর্ণচরে কর্মরত সাংবাদিকদের সাথে ওসির মতবিনিময়

আপনার মতামত লিখুন