রোববার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২১ | ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
গাঁও গেরাম

এক পর্যটন কেন্দ্রে দুই মাসেই ক্ষতি ৩শ’ কোটি টাকা

আবদুল আজিজ, কক্সবাজার
১৩ জুন ২০২১

করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত খাতের মধ্যে পর্যটন শিল্প অন্যতম। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে বাংলাদেশের প্রধান পর্যটন কেন্দ্র-কক্সবাজারের সৈকত ও বিনোদনকেন্দ্রগুলোতে পর্যটকের আনাগোনা নেই। দিনের পর দিন খালি পড়ে আছে সাড়ে ৪ শতাধিক হোটেল-মোটেল। দ্বিতীয় ঢেউয়ের পর থেকে এ খাতে লোকসান হয়েছে ৩শ’ কোটি টাকার বেশি। কর্মহীন হয়ে পড়েছেন এ খাতের ওপর নির্ভরশীল অর্ধলক্ষাধিক মানুষ। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে আগামীতে হাজার কোটি টাকারও বেশি লোকসানের কথা জানান পর্যটনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে দেশের জেলাগুলোর মধ্যে আক্রান্তের দিক দিয়ে বর্তমানে কক্সবাজার জেলা ৫ নম্বরে রয়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে সংক্রমণ বৃদ্ধির পাশাপাশি স্থানীয়দের মধ্যেও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে দিন দিন। এই পরিস্থিতে গত ৫ এপ্রিল থেকে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত ও বিনোদনকেন্দ্রগুলো বন্ধ রয়েছে। এতে সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছে পর্যটননগরী কক্সবাজার। কক্সবাজারের সাড়ে চার শতাধিক হোটেল-মোটেল-গেস্টহাউজের পাশাপাশি তিন শতাধিক রেস্টুরেন্ট, বিপণিবিতান, সৈকত সংলগ্ন শপিং মল, সৈকতের কিটকট, ট্যুর অপারেটরদের কার্যক্রম, বিচ বাইকসহ পর্যটন সংশ্লিষ্ট সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানসমূহে ব্যবসা বন্ধ থাকলেও প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম ও যন্ত্রপাতি টিকিয়ে রাখতে স্বল্প সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশপাশি বিদ্যুৎ চালু রাখতে হচ্ছে। এতে দিনদিন লোকসানের পরিমাণ বাড়লেও করোনাভাইরাসের কারণে কোনও সম্ভাবনা দেখছেন না এ শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা।

কক্সবাজার বিচ কিটকট মালিক সমিতির সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত এখন পর্যটকশূন্য। মানবশূন্য সৈকতে  শুনশান নীরবতা। দীর্ঘ দুই মাস সৈকতে কোনোধরনের মানুষ প্রবেশ করতে দেয়নি প্রশাসন। কাজেই কিটকট ব্যবসায়ীরা ভালো থাকার কথা না। সৈকতে কিটকট মালিক-কর্মচারীসহ এক হাজার মানুষ দুই মাস ধরে বেকার। তাদের কোনও আয় রোজগার নেই। ইতোমধ্যে অনেকেই অর্থসংকটে পড়েছেন। ফলে আমরা সবাই অসহায় হয়ে পড়েছি।’

কক্সবাজার হোটেল-মোটেল-গেস্টহাউজ অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ বলেন, ‘করোনার কারণে দফায় দফায় লকডাউনে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কক্সবাজারের পর্যটন শিল্প। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে পর্যটন বন্ধ থাকায় কক্সবাজারের সাড়ে ৪ শতাধিক হোটেল-মোটেল-গেস্টহাউজের কর্মকর্তাসহ এক লাখ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। পরে এ শিল্পে নতুন শ্রমিক তৈরি করতে অনেক বেগ পেতে হবে। তাই এসব শ্রমিকদের বাঁচিয়ে রাখতে কিছু একটা করা প্রয়োজন। এসব বিষয় নিয়ে গত শনিবার (২২ মে) বিকালে কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের সঙ্গে বৈঠকে আমাদের দুর্দশার কথা জানিয়েছি। স্বাস্থ্যবিধি মেনে পর্যটন খুলে দিলে আমরা উপকৃত হবো।’

ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-টোয়াবের সভাপতি তোফায়েল আহমদ বলেন, ‘করোনায় সারাবিশ্বের মতো আমাদের দেশও নিস্তব্ধ। এ কারণে দেশের অর্থনৈতিক খাতে নেমে এসেছে স্থবিরতা। বিশেষ করে পর্যটন খাতে যে স্থবিরতা নেমে এসেছে, তা পুষিয়ে উঠতে অনেক বছর সময় লেগে যাবে। তাই, করোনা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে যত দ্রুত সম্ভব স্বাস্থ্যবিধি মেনে পর্যটন চালু করতে হবে। যাতে পর্যটন শিল্পে জড়িতরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারে। এতে করে সরকার রাজস্ব আদায়ে সেই আগের অবস্থা ফিরে পাবে।’

কক্সবাজার কলাতলী মেরিনড্রাইভ রোড হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুখিম খান বলেন, ‘কক্সবাজার পর্যটন শিল্পে প্রতিদিন ৫ কোটি টাকারও বেশি লোকসান হচ্ছে। সেই হিসাবে গত দুই মাসে ৩শ’ কোটি টাকারও বেশি টাকা লোকসান হয়েছে। এতে বেকার হয়ে পড়ছে অর্ধলাখ মানুষ। করোনা পরিস্থিতি অস্বাভাবিক থাকলে লোকসানের মাত্রা আরও ভয়াবহ হবে।’

কক্সবাজার হোটেল-মোটেল-গেস্টহাউজ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম সিকদার বলেন, ‘করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে কক্সবাজারের সাড়ে ৪ শতাধিক হোটেল-মোটেলসহ সবকিছু বন্ধ রয়েছে। এসব হোটেলের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও হোটেল সচল রাখতে আমাদের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে রেখে দিতে হয়েছে। সেইসঙ্গে রয়েছে বিদ্যুৎ বিল ব্যাংক ঋণ। আমরা চরম দুশ্চিন্তার মধ্যে রয়েছি। আমাদের সংগঠনের ২৬০টি হোটেলে প্রতি মাসে ৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা লোকসান হচ্ছে। তিনশ’ কোটি নয়, সবমিলিয়ে গত দুই মাসে কক্সবাজার পর্যটন শিল্পে ৫শ’ কোটিরও বেশি টাকা লোকসান হয়েছে। এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ অর্ধলাখ মানুষ বেকার হয়ে পড়েছে।’

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. আমিন আল পারভেজ বলেন, ‘২২ মে হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দ ও পর্যটন শিল্পে জড়িত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে জেলা প্রশাসনের একটি বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে তাদের কথাগুলো আমরা মনোযোগ দিয়ে শুনেছি। তবে এই মুহূর্তে আমাদেরও করার কিছু নেই। করোনা সবকিছু তছনছ করে দিয়েছে। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পর্যটন খুলে দেওয়া হবে।’

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (পর্যটন সেল) মো. আবু সুফিয়ান বলেন, ‘কক্সবাজারে এখন করোনার ঊর্ধ্বগতি। আগামী ৩০ মে পর্যন্ত কক্সবাজারে কঠোর লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। এ কারণে কক্সবাজার পর্যটন খুলে দেওয়ার কোনও চিন্তাভাবনা নেই। যদি করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়, তাহলে পর্যটন খুলে দিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করবো। বিশেষ করে আগামী ৩০ মে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। পর্যটন শিল্পের ক্ষতির দিকটি অবশ্যই সরকারে বিবেচনায় রয়েছে।’

সংকটে পর্যটন সেক্টর, বন্ধ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান
চীনের বিস্ময়কর ‘লাল পর্যটন’!

আপনার মতামত লিখুন