রোববার, ২২ মে ২০২২ | ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ
বাবা দিবস

গড়পড়তা সাধারণ ‘বাবা’

উম্মে সালমা
২১ জুন ২০২০

স্মৃতি কোন পথ ধরে সজ্ঞানে চলতে শুরু করে? খাতার ঠিক কোন পাতা হতে স্মৃতি জমতে শুরু করে? আমাদের প্রাচীনতম স্মৃতি কোনটি? আমরা কি জানি! ‘বাবা’ নিয়ে ভাবতে বসে এমনই হট্টগোল মগজে! কোনটা আগে, কোনটা পরে! 

ছোটবেলা, খু-উ-ব ছোট্টবেলা থেকেই আমার সাতিশয় কান্নাকাটির অভ্যেস। বড় সন্তানের আদর নাকি বাড়াবাড়ি রকমে বেশি হয়- আমার ছেলেপুলে নেই আমি জানি না তেমন; লোকে বলে। হতে পারে এজন্যেই আব্বুর পক্ষ থেকে ‘আমার মেয়েকে কাঁদিয়ে কাজ করতে হবে না’ মর্মে নিষেধাজ্ঞার কড়াকড়ি। অধিকাংশ দিন অফিস থেকে ফিরে হয় নিজেই রান্নায় লেগে যান অথবা আমার দায়িত্ব বুঝে নিয়ে আম্মুকে দেন রসুইঘরের দুয়ারে বসিয়ে। এগুলো আমার ব্যাঙাচিবেলার ঘটনা, অথচ কি স্পষ্ট ভাবতে পারি, দেখতে পাই আমি কি অজানা ক্রোধে কেঁদে চলেছি আর অফিসফেরত ইউনিফর্ম পরিহিত কেউ বুকেপিঠে করে আমাকে শান্ত করার চেষ্টা করছেন। এইতো, যেন সব এই দু’চোখেই দেখেছি এতো জীবন্ত! 

ব্যাঙাচি লেজ খসতে না খসতেই আম্মুর কঠোর নিয়মানুবর্তিতায় সব কান্নাকাটি কোথায় গেল উবে! প্রথম স্কুল, তাও কিন্ডারগার্ডেন, আম্মুর মাথায় আর আমাদের বইয়ের ব্যাগে সমপরিমাণ চাপ; প্রথম হবার চাপ, সেরা হবার চাপ। আর আব্বু? তার কোনো পাত্তা নেই এইসবে। অফিস থেকে ফেরা মানেই আমাদের ছুটি- শোনো, পড়া পড়া করে বাচ্চাদের মাথা খাবা না। বই-হোমওয়ার্ক- বন্ধ!

প্রতি শুক্রবার আমাদের বেড়ানোর দিন। যেহেতু আব্বুর এক বছর পরপর বদলি, যখন যেখানে থাকি, সেখানকারই সবকিছু ঘুরে আসা হয়। হয়তো এক জায়গাতেই কয়েকশতবার- যেমন কক্সবাজার সী-বীচ! মাঝে মাঝে জিপ থামিয়ে এই ফুল ওই ফুল দেখি, পাহাড় দেখি। একটা ক্যামেরা আছে আমাদের যা দিয়ে ফটোগ্রাফার আব্বু বিশ্বের উদ্ভটতম ফটোগুলোর টপ-লিস্টেড ফটোগুলো তোলেন।

যেসময় বিটিভির মতোন এমনি এমনিই একুশে টেলিভিশন দেখা যেতে শুরু হলো, ঘরের সব দরজা জানালা বন্ধ করে পর্দা টেনে দিয়ে সিনেমা হল বানানো হতো। ১৮ ইঞ্চি নিপ্পন টেলিভিশনে সাদাকালো সিনেমা দেখি সবাই- নাচের পুতুল কিংবা জীবন থেকে নেয়া! 

আচার খেয়ে খেয়ে বরইবীচি মেঝেতে ফেলছি বলে গলায় পলিথিন বেঁধে দেন ঠিকই। আবার তিনিই আম্মুকে ক্ষেপাবেন বলে মোছা ঘরে বাইরের জুতো নিয়ে হেঁটে ঘর নোংরা করেন; অহেতুক বালতি ভরে মাছ কিনে আনা, বকাবাদ্যির সময় আই কন্ট্যাক্ট এড়াতে কালো সানগ্লাস এবং তিন কন্যাপরিবিষ্ট হয়ে বসে থাকা সবকিছুই আনন্দোৎসব। তার কখনো মন খারাপ নেই। প্লেয়ারে আম্মুর অপছন্দের মুজিব পরদেশীর গান ছেড়ে ক্যাসেট আছাড়ের সাথে সাথে কতবার পরদেশী’র হাত পা কলিজা পর্যন্ত ভাঙলো তা নিয়েও আসলে ওনার মাথাব্যথা হতে দেখিনি কখনো। অথচ বিকেলের পেঁয়াজু, মুঠো থেকে ফুঁ টানে মুড়ি খাওয়া, হোটেলের মুগডালে বাসায় বানানো পরোটা খাওয়াটাও গুরুত্বপূর্ণ সব ইভেন্ট!

তিন গেইটের একটা বাড়ি, বাড়ির চারদিক ঘিরে লেক , বিশাল সাইজের একটা নৌকাও- মাথাভর্তি এমন রাজ্যের পরিকল্পনা। এসব বড় বড় চিন্তা করতে করতে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সঞ্চয় করবার মতো মামুলি বিষয় ভাবনাতেই আসে না! খেলতে গিয়ে ধুপধাপ পড়ে যাওয়া, দুধেভাতে খেলার ভয় এবং ঘড়ি, দূরত্ব, পৌনে, সোয়া, আধা বিষয়ক নানা মৌলিক নিরক্ষতার দরুন আম্মুর রুটিন দাবড়ানি থেকে আমাকে মুক্তি দিতে আব্বুর তেমনই ‘বিরাট’ পরিকল্পনা- ইন্দিরা দেবীর পুতুল পুতুল, আরো গাদা গাদা রূপকথার বই, রংপেন্সিল আমার হাতে তুলে দেয়া; আর আমিও হয়ে উঠতে শুরু করি বাপেরই মতোন হেড ইন দ্যা ক্লাউডস!

নাহ, লেখা যায় না। বাবা’র গল্প সবার আছে। কিন্তু তা খুব ব্যক্তিগত আলাপ ছাপিয়ে সর্বজনীন করে তুলতে পারাটা কম চ্যালেঞ্জিং নয়। যতোগুলো দিক সুনির্দিষ্ট করতে পারলে বাবার মহত্ব, ত্যাগ-বিসর্জনকে মহীয়ান করে তোলা যায়, সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক বলা যায়, ততোটা কোনোদিন আবিষ্কার করতে পারিইনি আসলে। সেই তো তাকে পেলাম শৈশবের অবোধ একটা যুগ কেবল। ছোট ছোট কত ঘটন-অঘটনের মহাকাব্য লেখা হয়েছে এই অল্প সময়ে, বিশাল কর্মযজ্ঞ। সময়ও বহুকিছু ঢেকে-চেপে চলে গেছে। এতো নিবিড় সব আনন্দ ভালোবাসা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন ১৮ বছর হয়!

তার হয়তো মনযোগ নেই, হয়তো জানবেন না রক্তের সম্পর্ক নয় এমন স্বল্প-দীর্ঘ অনেক সখ্যতা এসেছে, ভেঙ্গে গেছে, নতুন রূপে এসেছে। একজন বাবা ফয়েজ এর লক্ষকোটি অভ্যেস চর্চা টুকরো টুকরো করে খুঁজে পেয়েছি টুকরো মানুষের ভেতর; এমনও হয়েছে একজনের মধ্যেই যেন ঢুকে বসে আছে বন্ধু হয়ে, ঈশ্বর হয়ে কেউ পথ দেখিয়ে চলেছেন। এসব তিনি হয়তো জানেন না। তবে এটুকু তো অবশ্যই জানবেন, ঢাকা থেকে ফিরে যে সাইকেল আর হারমোনিয়াম এনে দেবার কথা ছিলো, তা আমরা এখনো হাতে পাইনি। হ্যাঁ, সেন্টমার্টিন যাওয়া হয়েছে, তাকে ছাড়াই, এ বছর। তিনি অবশ্যই জানবেন রোজ তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাবার সময় আমার, আমাদের ভালোমন্দের তথ্য হালনাগাদ দিয়ে যাই; রোজ রাতে তার ছবিতে হাত মুছে ঘুমাতে যাওয়াটা অভ্যেস; তিনি অবশ্যই জানবেন আম্মু কোনোভাবেই কমতি রাখেননি কোনো আদরের।

স্মৃতির নিয়ম ঝাপসা হওয়া; সবকিছু মিলেই তাই হয়তো এমন দিনও যায় সারাদিনে একবারও স্মরণে এসেও আবার আসেন না। মিস করি না! 

শুধু শুক্রবার কাওকে অফহোয়াইট পাঞ্জাবি টুপি আতরের তাড়াহুড়োতে জুম্মায় যেতে দেখলে ১৮ বছর আগের ঝাপসা আব্বুর কথা মনে পড়ে! স্পষ্ট মনে পরে সময়টা কি দারুণ ছিলো! 

আজ এই মুহূর্তে নতুন করে আফসোস হচ্ছে আপনার সাথে একটা ভালো ছবি নেই বলে! যেটা এই শব্দগুলোর সাথে জুড়ে দেয়া গেলে, আম্মুর ভাষায় ‘হাঁটুতে বুদ্ধি’ মৌলিক জ্ঞান নিরক্ষর এই কন্যার লেখাটা একটা ‘আধা’ পরিপূর্ণতা পেতেও পারতো! পরেরবার স্বপ্নে এলে ন্যুডলস খেতে খেতে দশ পদের ঝামেলার আলাপ শেষে অভ্যাসবশত ফোন নাম্বার চাইবার সাথে একটা সেলফিও চেয়ে নিব নাহয়! ইচ্ছে হলে দেবেন নাহলে প্রতিবারের মতোনই নানা বাহানায় ইচ্ছেপূরণ না করেই চলে যাবেন।

কিন্তু আপনার স্বতঃস্কূর্ততা, নিজের মতোন করে চলা, ক্ষমা করে দেয়া আর ১৮০ ডিগ্রী টার্ন আমার জীবনধর্মের গুরুত্বপূর্ণ পাঠ হয়ে আছে, থাকবে যতদিন বেঁচে আছি!

লেখক : একটি বেসরকারি নীতি-অধিপরামর্শবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত

আব্বা এবং আব্বা......
সুবর্ণচরে ভাঙা রাস্তা সংস্কার করল ছাত্রলীগ

আপনার মতামত লিখুন