বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২০ | ২৫ আষাঢ় ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
দেখা থেকে লেখা

ইলিশ কুটুমের বাড়ি

পল্লব মোহাইমেন
২৩ জুলাই ২০১৯

চাঁদপুরে ইলিশের বাড়িতে ইলিশের ভাস্কর্যবড়সড় লঞ্চটা যখন ঘাটে ভিড়ছে, তখন তিন তলার করিডোরে দাঁড়িয়ে মনে হলো ইলিশ স্বাগত জানাচ্ছে। নিচে তাকিয়ে পেলাম দেশি নৌকার পাটাতনে হালি ধরে ধরে সাজানো, ইলিশের বৃত্ত। ঘাটের দিকে তাকাতে বড় এক সাইনবোর্ড নজর কাড়ল—‘ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর, স্বাগতম’।

এই যাত্রা ইলিশ ঘিরে, ইলিশময়। সেও আবার ইলিশের বাড়িতে। সদরঘাট থেকে বোগদাদীয়া ৭ লঞ্চ ছেড়েছিল ঠিক সকাল ৮টা ৩৫ মিনিটে। চাঁদপুর নদীবন্দরে গিয়ে নামতে নামতে বেলা পৌনে ১২টা। মেঘলা আকাশ। রোদ আছে, তা কড়া না তেমন। ঘাটেই অপেক্ষা করছিলেন চাঁদপুরের অ্যাডভোকেট আকাশ। শুরুতেই বললেন, ‘একটা কাজ তো হবে, আরেকটা নাও হতে পারে। এখন তো কোনো ইলিশ ধরার নৌকা পাবেন না। গত দুদিন বৃষ্টি ছিল, মাছ ধরার নৌকা তেমন একটা বের হয়নি। এখন তো একটা নৌকাও নেই।’

চাঁদপুরের ইলিশের আড়ত দেখা, আর ইলিশ মাছ ধরার নৌকায় যাওয়াই ১৯ জুলাই চাঁদপুর যাওয়ার উদ্দেশ্য। আকাশের কথা শুনে বর্ষার আকাশের মতো মনে একটুখানি মেঘ জমল। ‘ঠিক আছে চলেন আগে আড়তে যাই।’ বলি আকাশকে। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা রওনা হলো মাছঘাটের দিকে।

এটা হলো চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমবায় সমিতির আড়ত। রাত–দিন ২৪ ঘণ্টাই মাছ আসে এখানে। ইলিশের এই মৌসুমে ইলিশই বেশি। সকালের দিকে বেশি আসে ইলিশ। আমরা যখন গেলাম সেই মধ্যাহ্নে বরফ দিয়ে প্যাকেট হচ্ছে মণকে মণ ইলিশ মাছ। সরগরম চারদিক। পাইকারি বিকিকিনি যেমন চলছে, তেমনি আছে খুচরা বিক্রির ব্যবস্থাও।ইলিশ এবার কেমন? দাম কেমন?

কমবেশি সব বিক্রেতারই একই উত্তর—তেমন না, দাম বাড়তি (বেশি)।

বিস্তারিত জানা গেল এই সমিতির সভাপতি আবদুর বারী জমাদারের কাছ থেকে। নতুন ইলিশ মাছ আসছে ১ মে থেকেই। তবে এবারের আমদানি কম। ‘প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০ মণ ইলিশ এবার বেচাকেনা হচ্ছে এই আড়তে। আগের চেয়ে কম। মাছ কম, তাই দাম বেশি। সাধারণত এ সময়টায় দাম আরও কম থাকে।’

মাছের আমদানি কম কেন? আবদুর বারী জমাদার বললেন, ‘নদীর নাব্যতা কমে যাচ্ছে। আর সরকারি সিদ্ধান্তে প্রায় দুই মাস ধরে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা বন্ধ আছে। অথচ এটা মাছ ধরার ভালো সময়। তবে ওদিকে বিদেশি জেলেরা ঠিকই এসে মাছ ধরে নিয়ে যাচ্ছে।’

তারপরও মন ভরে যাচ্ছে আড়তের শোলার বাক্সে বাক্সে সাজানো রূপালি ঝলক দেখে। তাজা ইলিশ বুঝি একেই বলে। ঘাড় কালো, শরীর সাদা, রুপালি আঁশ, পেটের দিকে হালকা লাল—পদ্মার ইলিশ বলে কথা। দাম সে তো গ্রামে গ্রামে বাড়ে। সেদিনের দামের কথাটা বলা যায়। এই আড়তে মাছ খুচরা বিক্রি হয় কেজি দরে। বিক্রেতাদের জন্য মণ দরে। ৭০০–৮০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ আট–নয় শ টাকা। এক কেজির কম পর্যন্ত এমনই। কেজির ওপরে হলেই ১২–১৩ শ টাকা। সোয়া কেজির ইলিশ দেড় হাজার টাকা কমসে কম। ইয়া বড় রুপালি–গোলাপি চকচকে ইলিশ দেখে সাহস করে জিজ্ঞেস করলাম, ওজন কত? ‘দুই কেজি’। দাম? প্রতি কেজি ২ হাজার ৬০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত। বুঝলাম এগোনো সম্ভব না। তবে আশ্বস্ত হলাম শুনে, ৮০০–৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের স্বাদই নাকি সেরা।

এখানে গুণগতভাবে ইলিশ দুই প্রকার। লোকাল ইলিশ আর নামার ইলিশ। বুঝি না? বিক্রেতারা বুঝিয়ে দেন—লোকাল মানে পদ্মার ইলিশ। মূলত চাঁদপুরের কাছেই হাইমচরের ইলিশ। আর ভোলা, হাতিয়া থেকে আসা ইলিশ হলো ‘নামার’।

চাঁদপুরের সঙ্গে রেল, সড়ক ও নদীপথের যোগাযোগ থাকায় এই আড়ত প্রাচীন এবং সুবৃহৎ। আবদুল বারী জমাদার তথ্য দেন, এই মৎস বিপণিকেন্দ্রের বয়স তিন–চার শ বছর। আশপাশের এলাকা থেকে তো মাছ আসেই, হাতিয়া দ্বীপ, ভোলা এবং আরও দক্ষিণের নদী থেকে মাছ আসে। জেলে নৌকার খোঁজে আড়তে টাটকা মাছের মুগ্ধতা কাটে না। তবে মন পড়ে আছে নদীতে। যদি কোনো জেলে নৌকা দেখা যায়। অনেককে বলা হলো, সবাই বলল, দূরে যেতে হবে। তবে পাবেন কিনা তা ভাগ্যের ব্যাপার। আকাশের অবস্থা ভালো না, এখন মাছ ধরার নৌকা নেই বললেই চলে।

গিয়েই দেখি না। একটা ইঞ্জিনচালিত নৌকা ভাড়া করা হলো। উঠেই চোখে পড়ল বয়া। আত্মায় একটু পানি পেলাম। মেঘনা নদীতে শুরু হলো যাত্রা। ওপরে কালো মেঘ। ঢেউগুলোও বেশ বড়। পদ্মা–মেঘনা–ডাকাতিয়া নদীর যে উত্তাল মোহনা, তার দিকে তাকিয়ে কোনো কূল কিনারাই চোখে পড়ে না। নৌকা চালক সুফী বললেন, ‘একটা দুইটা পাইতে পারি নৌকা।’ সংশয়, নৌকা যদিও পাই জালে ইলিশ দেখতে পাব তো?

মিনিট দশেক চলার পর দূরে একটা আবছা মাছ ধরার মাঝারি নৌকা চোখে পড়ে। ক্যামেরার লেন্স জুম করে দেখি মাছ ধরার নৌকা। সুফি বলেন, ‘জাল গোটাচ্ছে।’ ‘চলেন’। আরও ১০ মিনিট চলার পর সেই নৌকার কাছে যেতে পারলাম। সাত–আটজন মাঝিমাল্লা বিস্তৃর্ণ এলাকাজুড়ে বিছানো জাল গোটাচ্ছেন। নিচে নদী কিছুটা অশান্ত। তাঁদের হাত–পায়ের মাংসপেশিই বলে দিচ্ছে কাজটায় কতটা শক্তি লাগছে। ওদিকে মাছ ধরার আরেকটা নৌকা ফিরে যাচ্ছে। চিৎকার করে জানা গেল কোনো ইলিশ সেটায় ধরা পড়েনি।

আমাদের সামনের নৌকার জাল তখন প্রায় অর্ধেক গোটানো হয়েছে। একটা সাদা কিছু চোখে পড়ল। কী মাছ? ‘পোয়া’। জাল গুটিয়ে যাচ্ছে, মাছের দেখা নেই। সুফী বললেন, শেষে যে পকেট আছে (নীল বড় প্লাস্টিকের ড্রামের মতো), সেখানে মাছ পাবে।

সুফীর কথা একদম ঠিক। পকেটে জাল গোটাতেই রুপালি ঝিলিক, জালে। একটা ছোট, একটা বড়। দুটি মাছ। একটি ইলিশ। ওই নৌকার মাঝিরা নিশ্চিত করলেন, ওটা ইলিশ। ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক। অশান্ত নদী, ফোকাস–টোকাসের কী হবে জানি না। কিন্তু জ্যান্ত ইলিশ—জীবনে এই প্রথম। নৌকার মাঝিদের বলতেই জালে ধরা ইলিশটা আবার দেখালেন, তখনো কান নাড়ছে। ওদিকে বৃষ্টির আলামত। জেলে নৌকা দ্রুত ধরল ফিরতি পথ। আমাদের নৌকাও, তবে তখন সদ্য দেখা জ্যান্ত ইলিশের আবেশ পুরো অনুভবে।

সবুজ হবে পদ্মা সেতুর দক্ষিণ প্রান্ত
দৃষ্টিনন্দন আরেক হাতিরঝিল হবে বুড়িগঙ্গা ঘিরে

আপনার মতামত লিখুন