সোমবার, ১৫ জুলাই ২০২৪ | ৩১ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
দেখা থেকে লেখা

চৈত্রের গরমে প্রাণ জুড়াতে কক্সবাজারে

সোহেল সরওয়ার
০৩ এপ্রিল ২০২২

করোনার সংক্রমণ কমে আসায় বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের শহর কক্সবাজারে পর্যটকদের পদচারণা বেড়েছে। চৈত্রের গরমের মধ্যে পরিবার-পরিজন নিয়ে এখানে ঘুরতে আসছেন পর্যটকরা।

১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সৈকত সৈকতের বৈশিষ্ট্য হলো- পুরো সমুদ্র সৈকতটি বালুকাময়, কাদার অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। বালিয়াড়ি সৈকত সংলগ্ন শামুক-ঝিনুকসহ নানা প্রজাতির প্রবাল সমৃদ্ধ বিপণি বিতান, অত্যাধুনিক হোটেল-মোটেল-কটেজ, বার্মিজ মার্কেটসমূহে পর্যটকদের বিচরণে কক্সবাজার শহরে পর্যটন মৌসুমে প্রাণচাঞ্চল্য থাকে।  

শীত-বর্ষা-বসন্ত-গ্রীষ্ম এমন কোনও ঋতু নেই যখন সমুদ্র সৈকতের চেহারা বদলায় না। প্রত্যুষে এক রকম তো মধ্যাহ্নে এর রূপ অন্য রকম। দেশি-বিদেশি পর্যটকরাও এই সৈকতে আসেন। গড়ে ভরা জোয়ারে ২০০ মিটার (৬৬০ ফুট) আর নিম্ন জোয়ারে ৪০০ মিটার (১৩শ ফুট) প্রশস্থ। ভাটার সময় চোরাবালি জেগে ওঠে বিধায় বিপজ্জনক হয়ে উঠে।

নবম শতাব্দীর গোড়ার দিক থেকে ১৬১৬ সালে মুঘল অধিগ্রহণের আগে পর্যন্ত কক্সবাজারসহ চট্টগ্রামের একটি বড় অংশ আরাকান রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। মুঘল সম্রাট শাহ সুজা পাহাড়ি রাস্তা ধরে আরাকান যাওয়ার পথে কক্সবাজারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন এবং এখানেই ক্যাম্প স্থাপনের আদেশ দেন। তার যাত্রাবহরের প্রায় এক হাজার পালঙ্কী কক্সবাজারের চকরিয়ার ডুলাহাজারা নামের স্থানে অবস্থান নেয়। ডুলাহাজারা অর্থ হাজার পালঙ্কী। মুঘলদের পর ত্রিপুরা এবং আরকান তারপর পর্তুগিজ ও ব্রিটিশরা এই এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয়।

কক্সবাজার নামটি এসেছে ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স নামে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক অফিসারের নাম থেকে। কক্সবাজারের আগের নাম ছিল পালংকি। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অধ্যাদেশ, ১৭৭৩ জারি হওয়ার পর ওয়ারেন্ট হোস্টিং বাংলার গভর্নর হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। তখন হিরাম কক্স পালংকির মহাপরিচালক নিযুক্ত হন। ক্যাপ্টেন কক্স আরাকান শরণার্থী এবং স্থানীয় রাখাইনদের মধ্যে বিদ্যমান হাজার বছরেরও পুরোনো সংঘাত নিরসনের চেষ্টা করেন।  

শরণার্থীদের পুনর্বাসনে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সাধন করেন তিনি কিন্তু কাজ পুরোপুরি শেষ করার আগেই মারা (১৭৯৯ সাল) যান। তাঁর পুনর্বাসন অবদানকে স্মরণীয় করে রাখতে একটি বাজার প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং এর নাম দেওয়া হয় কক্স সাহেবের বাজার। কক্সবাজার থানা প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৫৪ সালে এবং পৌরসভা গঠিত হয় ১৮৬৯ সালে।

পর্যটন শিল্পকে কেন্দ্র করে এখানে গড়ে উঠেছে অনেক প্রতিষ্ঠান। বেসরকারি উদ্যোগে নির্মিত অনেক হোটেল, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের নির্মিত মোটেল ছাড়াও সৈকতের নিকটেই কয়েকটি পাঁচতারা হোটেল রয়েছে। এছাড়া এখানে পর্যটকদের জন্য গড়ে উঠেছে ঝিনুক মার্কেট। সীমান্তপথে মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, চীন প্রভৃতি দেশ থেকে আসা বাহারি জিনিসপত্র নিয়ে গড়ে উঠেছে বার্মিজ মার্কেট।

কক্সবাজারে বিভিন্ন উপজাতি বা নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী বাস করে যা শহরটিকে করেছে আরো বৈচিত্র্যময়। কক্সবাজার শহর ও এর অদূরে অবস্থিত রামুতে রয়েছে বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের পবিত্র তীর্থস্থান বৌদ্ধ মন্দির। কক্সবাজারে শুধু সমুদ্র নয়, আছে বাঁকখালী নামে একটি নদীও। এই নদীটি শহরের মৎস্য শিল্পের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কক্সবাজার বাংলাদেশের সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর স্থান হিসেবে বিখ্যাত।

দেখা গেছে, সৈকত এখন লোকে লোকারণ্য। উত্তাল সাগরে ঢেউয়ের সান্নিধ্য গিয়ে সতর্ক থাকতে পর্যটকদের পরামর্শ দিচ্ছেন লাইফ গার্ড সদস্যরা। নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি পর্যটকদের স্বাস্থ্যবিধি মানতে মাইকিং করছে ট্যুরিস্ট পুলিশ। সৈকতের অংশগুলোর মধ্যে রয়েছে- লাবনী পয়েন্ট, কলাতলী পয়েন্ট, সুগন্ধা পয়েন্ট, দরিয়ানগর সৈকত, হিমছড়ি, ইনানী সৈকত, টেকনাফ সৈকত। এখান থেকে যাওয়া যায় সেন্টমার্টিন ও মহেশখালীতে।

ঢাকা থেকে ঘুরতে আসা পর্যটক দম্পতি শামীম ও তামান্না শারমীন বাংলানিউজকে বলেন, কক্সবাজারে অনেক আগে আসার কথা ছিল। কিন্তু সময়-সুযোগ হয়ে উঠেনি। করোনাকালে ভয়ে ছিলাম। এখন সংক্রমণ কম থাকায় পরিবারসহ ঘুরতে এসেছি সৈকতে।

সি সেইফ লাইফ গার্ডের সুপারভাইজার মোহাম্মদ ওসমান জানান, ঋতু পরিবর্তন হয়েছে। বেড়েছে সমুদ্রের ঢেউ। উত্তাল সাগরে নিয়ম মেনে গোসলে নামতে সবাইকে সতর্ক করা হচ্ছে। দুর্ঘটনা এড়াতে যেখানে পতাকা রয়েছে এবং লাইফ গার্ড কর্মীরা যেখানে অবস্থান করছেন সেখানে গোসল করা নিরাপদ।

ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজারের (টুয়াক) সভাপতি আনোয়ার কামাল জানান, কক্সবাজারে ২০০ থেকে ২৫০টি আবাসিক হোটেল-মোটেল রয়েছে। এর মধ্যে অনেকগুলো কক্ষ অগ্রিম বুকিং করা  হয়েছে।  

কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মহিউদ্দিন বলেন, কক্সবাজারে পর্যটক সমাগম বেড়েছে। সৈকত ও পর্যটন স্পটে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। কেউ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার শিকার হলে পুলিশ বক্স, তথ্যকেন্দ্র বা ট্যুরিস্ট পুলিশ ভবনে এসে অভিযোগ জানাতে পারবেন।  

পর্যটকদের জন্য দ্বার উন্মোচন করল মালয়েশিয়া
পর্যটন খাতে বাংলাদেশি বিনিয়োগ চায় শ্রীলঙ্কা

আপনার মতামত লিখুন