শুক্রবার, ১২ আগস্ট ২০২২ | ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ
মতামত

‘সংরক্ষিত এলাকা’ নারীর অপমান

আফরোজা পারভীন
১০ জানুয়ারি ২০২২
আফরোজা পারভীন : কথাশিল্পী, গবেষক, কলাম লেখক

আফরোজা পারভীন : কথাশিল্পী, গবেষক, কলাম লেখক

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে তোড়জোড় করে মেয়েদের জন্য এলাকা সংরক্ষিত করা হয়েছিল। গোলাপী বেলুনে সজ্জিত নির্ধারিত এলাকায় মেয়েরা হাসবে খেলবে সাঁতরাবে। স্বামী যাবে তার এলাকায়, বউ তার। প্রেমিকা তার, প্রেমিক তার। ভাই তার, বোন তার। জানি না তৃতীয় লিঙ্গের জন্য কী ব্যবস্থা।

কক্সবাজার প্রশাসন অত্যন্ত জাঁকজমক করে ঢাকঢোল পিটিয়ে দেদার টাকাপয়সার ফুলঝুরি ছিটিয়ে সংরক্ষিত এলাকা উদ্বোধন করে।? ভাবে না জানি কী একটা বিশাল কাজ করে ফেলেছে! তারপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে। এরই জেরে সম্ভবত ওপর থেকে নির্দেশিত হয়ে এই কর্মকাণ্ড বাতিল করেছে। ফাঁক তালে বেরিয়ে গেল বিশাল অঙ্কের টাকা। এমন কত টাকা যে কতভাবে অপচয় হচ্ছে তার হিসাব নেই!

স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে মনে রাখার মতো অনেক কিছু আমরা পেয়েছি। এটি ছিল তার মধ্যে একটা। ভাবতে কষ্ট হচ্ছে, মেয়েদের অধিকার আদায়ের জন্য কী কঠোর লড়াই করেছিলেন নবাব ফয়জুন্নেসা, বেগম রোকেয়া। সহশিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টিতে কত অবদান রেখেছিলেন বেগম ফজিলাতুন্নেসা। এই সেদিনের কথা। মেয়েদের স্কুলে পড়েছি। কলেজে এসে নারী পুরুষ একসঙ্গে পড়তে গিয়ে বুঝেছি পুরুষ শুধু পুরুষ না, বন্ধুও হতে পারে। আর আজ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছরে মেয়েদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা। ধিক। হোক বাতিল। কিন্তু করা যে হয়েছিল এটা দেশবাসী জানাল। ইতিহাস হয়ে থাকল। মেয়েরা জানাল তাদের অবস্থান। আগের দিনে বিড়াল শেয়ালের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য মুরগির বাচ্চা খাঁচা বা পোলো দিয়ে ঢেকে রাখা হতো। এ অনেকটা তেমন। বিড়াল শেয়াল শাসন করার ক্ষমতা নেই। বরং অপদস্ত করা সহজ নারীকে! এতে নারীকে কতটা অপমান করা হয়, কতটা অবদমন করা হয় তা বোঝার ক্ষমতা নিরেট প্রশাসনের নেই। এতে যে সন্ত্রাসীদের, ধর্ষকদের সাহস বাড়িয়ে দেওয়া হয়, বুঝিয়ে দেওয়া হয় তাদের শক্তির কাছে জেলা প্রশাসন নতজানু সেটা বোঝার ক্ষমতাও প্রশাসনের নেই। এটুকু বোঝার জন্য খুব উর্বর মাথাও দরকার হয় না, স্বাভাবিক বোধ-বুদ্ধি থাকলেই চলে।

কক্সবাজারে গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন এক পর্যটক নারী। এই নির্যাতিতা সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর বিচারের দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠে জনতা। ফেসবুকে তার প্রতিফলন ঘটে। জানা যায়, ধর্ষণ ঘটনার পর তিন দিন পুলিশের কাস্টডিতে থাকেন ওই নারী আর তার স্বামী পুত্র। তারপর ওই নারী আর তার স্বামী সন্তান ফিরেছে ঢাকায়। পুলিশ হেফাজতে থাকাকালীন তাদের নিয়ে ঘটেছে নানান ঘটনা। মেয়েটি দাবি করেছে সন্ত্রাসীদের শেখানো কথা বলতে তাকে ও তার স্বামীকে তারা জোর করেছে।

গত ২২ ডিসেম্বর স্বামী আর সন্তানকে নিয়ে কক্সবাজার বেড়াতে আসেন এই নারী।? লাবণী সি বিচে নামার সময় সন্ত্রাসীদের একজনের সঙ্গে ধাক্কা লাগে এই নারীর স্বামীর। এর জের ধরে পরদিন ওই নারীকে তুলে নিয়ে প্রথমে একটা ঝুপড়িতে তারপর একটা হোটেলে গণধর্ষণ করে সন্ত্রাসীরা। ট্রিপল নাইনে ফোন করার পরও ওই মহিলা কোনো সহযোগিতা পাননি। পরে র‌্যার এসে তরুণীকে উদ্ধার করে। ধর্ষণকালে মেয়েটির স্বামী ও কন্যাকে গুলি করার ভয় দেখায় সন্ত্রাসীরা। পরে তারা চিরকুটে লিখে দেয় পুলিশকে কী বলতে হবে। সেই অনুযারী কথা বলে মেয়েটি। সে কারণে মেয়েটির আগের জবানবন্দি আর পুলিশকে দেওয়া জবানবন্দিতে খানিকটা পার্থক্য দেখা গেছে।

কক্সবাজার সন্ত্রাস করার জন্য এক উর্বর এলাকা। এখানেই খুন হয়েছিলেন সেনা কর্মকর্তা সিনহা। এই কক্সবাজারেই গরু চুরির অপরাধে এক মা আর তার দুই মেয়েকে কোমরে রশি বেঁধে গরুর মতো টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। থানায় নিয়ে নির্যাতন চালানো হয়েছিল তাদের ওপর। অথচ পর্যটন এলাকা বলে কক্সবাজারে বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকা দরকার। যাতে মানুষ নির্ভয়ে কক্সবাজার যেতে পারে, সমুদ্র স্নান করতে পারে। এই ঘটনা ঘটার পর সোশ্যাল মিডিয়াতে ছিল মিশ্র প্রতিক্রিয়া। একশ্রেণি মেয়েটির ওপর ঘটা নির্যাতনের বিচার চাইলেও আরেক শ্রেণি মেয়েটির সম্বন্ধে কটূক্তি, অশোভন অশ্লীল বাক্য বর্ষণ করেই গেছে। যেন বেড়াতে যাওয়াটাই মেয়েটার অপরাধ। যেহেতু সে মেয়ে তাকে থাকতে হবে ঘরবন্দি, পর্দাবন্দি। মেয়েদের আনন্দ করা, বিনোদন করতে যাওয়া অপরাধ। সে মেয়ে হয়ে জন্মেছে। জন্মের ওপর তার হাত নেই। তারপরও স্বামী সন্তান নিয়ে বেড়াতে গেলেই সে নষ্টা, ভ্রষ্টা। কারণ সে মেয়ে। ‘ধর্ষকরা যা করেছে বেশ করেছে। আর এই ধরনের মেয়েদের কাছে এ অত্যাচার আরাম। তারা এটাই চায়।’ মন্তব্যকারীদের এক একটি মন্তব্য পড়ে মনে হয়েছে মেয়েটি যেন অনাবৃত শরীরে তাদের চোখের সামনে শুয়ে আছে। আর তারা মনে মনে তাকে ধর্ষণ করে তৃপ্ত হচ্ছে।

আমি বুঝি না কার মাথা থেকে এ ধরণের উর্বর পরিকল্পনা বের হয়। কারা চায় দেশটাকে হাজার বছর পিছিয়ে নিতে। আগে তো এত বোরখা ছিল না, হিজাব ছিল না, পর্দার বাড়াবাড়ি ছিল না। তারপরও মেয়েরা স্বাচ্ছন্দে যেখানে সেখানে যেতে পারত। এভাবে ধর্র্ষিত হতো না। এখন সাত আট বছরের শিশু কন্যা পর্যন্ত বোরখা, হিজাবে আবৃত। তারপরও তারা রেহাই পাচ্ছে না। কেন? এই অবক্ষয় কি এই পর্দারই কারণে! আগে নারীর চালচলন পোশাক-আশাকে একটা সহজ স্বাভাবিকতা ছিল। এখন বুঝি পুরুষ ভাইয়েরা ওই জামা কাপড় ছিঁড়ে খুঁড়ে দেখতে চায় ভেতরে কী আছে কী নেই? ধর্ষিতা মেয়েটি পর্দা করত কি করত না আমার জানা নেই। জানা আছে, সে পালাক্রমে ধর্ষণের শিকার হয়েছে। পুলিশের সাহায্য চেয়েও পায়নি। যখন সে বিচারের সম্মুখীন হয়েছে তখন জীবন বাঁচানোর জন্য তাকে আপস করতে হয়েছে। আর তার জেরে নারীদের নিরাপদ করার জন্য বিস্তীর্ণ সৈকতের সামান্য কিছু জায়গা মেয়েদের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। বাকি জায়গাগুলোতে পুরুষরা দাপিয়ে বেড়াবে। সেখানে না আসবে কোনো ঝিনুক বিক্রেতা না ফটোগ্রাফার না অন্য কেউ। কক্সবাজার গিয়ে প্রতিটি মেয়ে ভাববে সে জেলখানায় এসেছে।

আমাদের দেশে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এ খাত উপেক্ষিত যথাযথ পরিকল্পনার অভাবে। কক্সবাজার পৃথিবীর বৃহত্তম সৈকত। অথচ পাতায়া, কোরাল আইল্যান্ড বা দুসান বেতে যে পরিমাণ টাকা আয় হয় কক্সবাজারে তার এক চিমটিও না। না আছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, না পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা, না নিরাপত্তা। তাহলে দূর-দূরান্ত থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কে যাবে ওখানে, কেন যাবে।

কক্সবাজার সৈকতে মেয়েদের জন্য সংরক্ষিত এলাকাটি বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু তাতে কী। এর রয়েছে সুদূরপ্রসারী প্রভাব। ধর্ষণের মূল আসামি ধরা পড়েছে। জানা গেছে, সে চিহ্নিত ধর্ষক অন্যায়কারী। তার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ রয়েছে আগে থেকেই। জেলে ঢোকে, কী এক কারিশমায় যেন বেরিয়ে যায়। এ ঘটনার পর কক্সবাজার বা অন্য পর্যটন কেন্দ্রে যাওয়ার আগে পর্যটকরা দু’বার ভাববে। অল্প কিছুদিন আগে সিলেট এমসি কলেজে অনুরূপ ঘটনা ঘটেছিল। আমার তো মনে হয় সেদিন বেশি দূরে নয় যখন সহশিক্ষা বা সহকর্ম করার সুযোগ তুলে দেওয়া হবে। মেয়েদের ঠেলে দেওয়া হবে পুরোপুরি ঘরে। এই জাতীয় পরিকল্পনাকারী থাকলে এটা ঘটা আজকালের ব্যাপার মাত্র।

বেগমগঞ্জ ও এমসি কলেজের গণধর্ষণের ঘটনার পর জনমতের চাপে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ-ের বিধান করে আইন সংশোধন করা হয়েছে। কিন্তু ধর্ষণ কমেনি। কারণ আইনের ফাঁকফোকরগুলো ধর্ষকদের জানা। তারা জানে কীভাবে জেল থেকে বেরিয়ে যেতে হয়। জেল থেকে বেরিয়ে এরা হয় দাগী ধর্ষক! তখন এরা মরিয়া। এ থেকে মুক্তির একমাত্র পথ সামাজিক সচেতনতা। পরিবার থেকে, সমাজ থেকে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে নষ্ট ছেলেদের বহিষ্কার। এভাবে কিছু দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হলে মানুষ ধর্ষণ করতে ভয় পাবে। আস্তে আস্তে বদলাবে সমাজ। আমরা সেদিনের অপেক্ষায় আছি।

মারিতে তুষারঝড়ের ভয়ংকর অভিজ্ঞতা
ইতিহাসে এই প্রথম উটের জকি হিসেবে সৌদি নারীরা

আপনার মতামত লিখুন