শুক্রবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২২ | ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ
জাতীয়

বিশ্ব পর্যটন দিবস

বিশ্ব পর্যটন দিবস : তাল মেলাতে পারছে না দেশের পর্যটন খাত

অনলাইন ডেস্ক
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২

করোনার কারণে টানা দেড় বছর বড় সংকটে ছিল দেশের পর্যটন খাত। গত বছরের জুন থেকে স্বাভাবিক হতে থাকে পরিস্থিতি। একে একে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের পর্যটনের বন্ধ দুয়ার খুলে যায়। নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দুবাই, তুরস্ক, মিসর ও ভারতের মতো দেশ এখন পর্যটকে সরগরম। কিন্তু বাংলাদেশের পর্যটনের দরজা এখনও বিদেশিদের জন্য 'বন্ধ'। সব দেশ করোনার পর ঘোষণা দিয়ে 'পর্যটনের জন্য প্রস্তুত'- এমন বার্তা জানান দিলেও বাংলাদেশ এ বিষয়ে নীরব। এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড থেকে সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করেও মেলেনি ঘোষণা। ফলে বিদেশের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না পর্যটনের অপার সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ। তবে গতকাল সোমবার বিকেলে কভিড-১৯ সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির ৬০তম সভায় বিদেশিদের জন্য নিষেধাজ্ঞা বাতিলের সুপারিশ করা হয়। কিন্তু এখনও এ বিষয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় থেকে লিখিত কোনো ঘোষণা আসেনি।

এ অবস্থায় আজ মঙ্গলবার 'পর্যটনে নতুন ভাবনা' প্রতিপাদ্যে পালিত হচ্ছে বিশ্ব পর্যটন দিবস। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হবে দিবসটি। এ উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্যাসিফিক এশিয়া ট্রাভেল অ্যাসোসিয়েশন (পিএটিএ) এবং ইউনাইটেড নেশন ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অর্গানাইজেশন (ইউএনডব্লিউটিও) বিশ্ব পর্যটনের মোড়ল। বাংলাদেশও এ দুই সংগঠনের সদস্য। এ জন্য এ দুটি সংগঠনের অনুকূলে নিয়মিত চাঁদাও দিতে হয় সরকারকে।

সম্প্রতি পিএটিএ তাদের ওয়েবসাইটে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কভিড-পরবর্তী পর্যটন পরিস্থিতি নিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়েছে এবং তা নিয়মিত হালনাগাদ করছে। এ তথ্যগুলোর মধ্যে দেশের নাম, দেশটির লকডাউন পরিস্থিতি, দেশি-বিদেশি পর্যটকদের ভ্রমণ বিষয়ে দেশটির অবস্থান, ওই দেশের কভিডের টিকা প্রদান সম্পর্কিত তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হচ্ছে। এ তথ্যছকের মাধ্যমে একটি দেশের কভিড-পরবর্তী পর্যটন পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পাচ্ছেন পর্যটকরা। কিন্তু পিএটিএ প্রকাশিত এ তথ্যছকে প্রতিবেশী দেশগুলোর তথ্য অন্তর্ভুক্ত থাকলেও বাংলাদেশের কোনো তথ্য নেই। ফলে বিশ্বের মানুষ জানতে পারছে না বাংলাদেশ পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত কিনা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জাবেদ আহমেদ বলেন, একটি দিনক্ষণ নির্ধারণ করে বাংলাদেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলো বিদেশি পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করেছি। আমি চাকরি ছেড়েছি পাঁচ মাস আগে। তারও এক মাস আগে ট্যুরিজম বোর্ড থেকে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। বারবার আনুষ্ঠানিক ঘোষণার জন্য তারিখ চেয়েছি। কিন্তু মন্ত্রণালয় থেকে সেই অনুমতি মেলেনি। এখন বাংলাদেশের পর্যটন বিদেশিদের জন্য খোলা আছে ঠিকই; কিন্তু কেউ তা জানে না। একটি ঘোষণা এলে পিএটিএ বা অন্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ফলাও করে এ খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করতে পারত।

তিনি আরও বলেন, আমার ধারণা, এটি কে ঘোষণা দেবে- সেই কর্তৃপক্ষই ঠিক নেই। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় মনে করে, এটি তাদের এখতিয়ারের বাইরে। এতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মতি লাগবে। আবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ মনে করে, তারা কেন দেবে? অথচ বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সাহস করে ঘোষণা দিলেই কোনো অসুবিধা ছিল না।

ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের (ডব্লিউটিটিসি) সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, করোনার ধাক্কার পরও ২০২১ সালে বিদেশি পর্যটক থেকে ভারত ৮ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ডলার, থাইল্যান্ড ৩ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ডলার, মালদ্বীপ ২ হাজার ১৬০ মিলিয়ন ডলার, শ্রীলঙ্কা ৩০৫ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে। সেখানে বাংলাদেশ আয় করেছে মাত্র ১৬৭ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার, যা মিয়ানমারের আয় (২১২ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার) থেকেও কম। অন্যদিকে করোনার আগে ২০১৯ সালে বাংলাদেশ বিদেশি পর্যটক থেকে আয় করে ৩৬৯ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার, যখন থাইল্যান্ডের আয় ছিল ৬২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ডলার। তবে দেশি পর্যটক থেকে ২০২১ সালে বাংলাদেশের পর্যটন খাত পেয়েছে ৬ হাজার ৭৩৯ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার সমমূল্যের টাকা।

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবু তাহের মুহাম্মদ জাবের বলেন, করোনার পর বিদেশি পর্যটকদের স্বাগত জানাতে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ঘোষণা দেওয়ার জন্য আমাদের মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করেছি। কিন্তু মন্ত্রণালয় এখনও এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি।

এদিকে পর্যটন খাত ঘুরে না দাঁড়ানোর জন্য আরও কিছু কারণকে দায়ী করেন এ খাতের উদ্যোক্তারা। ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সভাপতি শিবলুল আজম কোরেশী বলেন, অন অ্যারাইভাল ভিসার আওতা আরও বড় করতে হবে। পাশাপাশি ই-ভিসার প্রচলন করতে হবে। একজন আমেরিকান নাগরিক দিল্লি থেকে এসেছিলেন। কিন্তু তাঁকে ভিসা দেওয়া হয়নি। ফলে খুব খারাপ বার্তা নিয়ে তিনি বাংলাদেশ থেকে ফেরত গেছেন। এটি পর্যটন শিল্পের জন্য ক্ষতিকর।

প্যাসিফিক এশিয়া ট্রাভেল অ্যাসোসিয়েশনের (পাটা) মহাসচিব তৌফিক রহমান বলেন, সব দেশ করোনা-পরবর্তী পুনরায় পর্যটন চালুর পরিকল্পনা করল। ঘোষণা দিয়ে সবাই পর্যটনকেন্দ্র উন্মুক্ত করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ তা পারেনি। কারণ এ দেশে পর্যটনকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। আন্তঃমন্ত্রণালয়ে সমন্বয়হীনতা আছে। পর্যটন মন্ত্রণালয়কে কেউ গুরুত্বই দেয় না।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব অ্যামিউজমেন্ট পার্ক অ্যান্ড অ্যাট্রাকশনসের (বাপা) উপদেষ্টা জিএম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এ খাতে সরকারের আমলাদের পর্যটনবিষয়ক কোনো জ্ঞান ও ধারণা নেই। তাঁরা শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই পর্যটন শিল্পকে বন্দি করে রেখেছেন। পর্যটনের বিকাশে অন্যান্য দেশের মতো সময়োপযোগী কোনো পরিকল্পনা নেই। আমলাতান্ত্রিক ও বিশৃঙ্খলভাবে চলছে পর্যটন খাত। সরকারের সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে পর্যটনবিষয়ক কোনো ব্যক্তি নেই। ফলে বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশ তাল মেলাতে পারছে না।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী বলেন, পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে দেশে সেই পরিবেশ এখনও সৃষ্টি হয়নি। পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নিতে অন অ্যারাইভাল ভিসা সহজ করতে হবে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে; বিদেশিরা যাতে খুব সহজে বাংলাদেশে আসতে পারেন। করোনা মহামারির কারণে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে বিদেশিদের ভিসা দেওয়া বন্ধ ছিল। সম্প্রতি সে বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হয়েছে। এখন আনুষ্ঠানিক ঘোষণাও দেওয়া হবে।

বাংলাদেশে পর্যটনকেন্দ্রগুলো এতো ব্যয়বহুল কেন?
স্বাধীনতার ৫১ বছরেও কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশা পূরণ হয়নি পর্যটনে

আপনার মতামত লিখুন