শুক্রবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২২ | ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ
মতামত

যেভাবে এগিয়ে যেতে পারে দেশের পর্যটনশিল্প

ড. সৈয়দ রাশিদুল হাসান
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২

দেশের জিডিপি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, বিভিন্ন ব্যবসায়িক খাতের উন্নয়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন প্রভৃতির মাধ্যমে পর্যটন খাত অর্থনীতিতে একটি বড় অবদান রাখছে। বাংলাদেশের পাহাড়, নদী, সৈকত, জীববৈচিত্র্য, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান, মধ্যযুগীয় মন্দির, প্যাগোডা, মসজিদ, গির্জাসহ বিভিন্ন এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য বাংলাদেশের নাগরিকদের এবং বিদেশি পর্যটকদের অভ্যন্তরীণ ভ্রমণের মাধ্যমে বাংলাদেশের পর্যটন সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে।

বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ড (বিটিবি) সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালে মোট ২ লাখ ৬৭ হাজার ২০৯ জন বিদেশি পর্যটক বাংলাদেশে আসেন। ২০১৯ সালে বাংলাদেশে আসা ভারতীয় পর্যটকের সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৭০ হাজার ২৪, যা বিদেশ থেকে আসা মোট পর্যটকদের প্রায় ৮৪ শতাংশ। সে বছর দেশে দ্বিতীয় সর্বোচ্চসংখ্যক বিদেশি পর্যটক আসেন (৭ হাজার ২২৫) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। চীন থেকে আসেন ৭ হাজার ৪ জন (তৃতীয় সর্বোচ্চ) এবং জাপান থেকে আসেন ৪ হাজার ১৯৫ জন (চতুর্থ সর্বোচ্চ)। একই বছর যেসব দেশ থেকে অধিকসংখ্যক পর্যটক বাংলাদেশ ভ্রমণে আসেন-এমন শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে আরও রয়েছে যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জার্মানি ও সৌদি আরব।

পর্যটনশিল্পের প্রবৃদ্ধি সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব ফেলে ক্ষুদ্র শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প যেমন: হোটেল ও রেস্টুরেন্ট, দোকান এবং বিশেষ বাজার, ট্যুর অপারেটর এবং বিনোদন সুবিধার ওপর, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে (টেবিলে কিছু পরিসংখ্যান উপস্থাপন করা হলো)। এ ছাড়াও স্থানীয় মানুষ পর্যটন খাতে উন্নত সেবা থেকে সুবিধা পান। পর্যটন উন্নয়নের সঙ্গে জড়িত দেশের অবকাঠামো, বিশেষ করে সড়ক ও রেল নেটওয়ার্ক, বিমানবন্দর সুবিধা, টেলিযোগাযোগ এবং আতিথেয়তা পরিষেবার উন্নয়ন।

বস্তুত পর্যটন উন্নয়নে আতিথেয়তায় পরিষেবার মান বজায় রাখার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আতিথেয়তা নিজেই একটি শ্রমনিবিড় শিল্প। ‘স্টাফ টু রুম রেশিও’ একটি জটিল বিষয়, যা স্থায়ী কর্মী এবং হোটেল রুম সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্যের একটি সর্বোত্তম স্তর নির্ধারণ করে। অনুন্নত দেশগুলোয় রুম রেশিও ২.৫:১ (প্রতিটি রুমের জন্য ২.৫ পূর্ণ সময়ের কর্মী) থেকে শুরু করে চীন, ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশে ২:১। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্যের মতো উন্নত দেশগুলোয় এ অনুপাত ১:১-এরও কম।

সাধারণত পরিষেবার মান নিশ্চিত করতে একটি তিন-তারকা হোটেলের বিভিন্ন বিভাগে মোট ২৫০ থেকে ৩৫০ জন কর্মী প্রয়োজন। এসব কর্মচারীর অবশ্যই অতিথিদের চাহিদা পূরণের বিষয়ে প্রশিক্ষণ থাকতে হবে। এ লক্ষ্যে হোটেলগুলো প্রশিক্ষিত মানবসম্পদ নিয়োগ করে। সাধারণত সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি সার্টিফিকেট এবং ডিপ্লোমা কোর্স থেকে শুরু করে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পর্যন্ত প্রদান করে। পর্যটন ও আতিথেয়তার সব ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের অধীনে জাতীয় হোটেল ও পর্যটন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (এনএইচটিআই) প্রতিষ্ঠিত হয়। পেশাদারত্বের বিকাশ এবং দেশে ও বিদেশে হোটেল ও পর্যটনশিল্পের জন্য প্রশিক্ষিত কর্মীদের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের জন্য দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনশক্তি সরবরাহ করার লক্ষ্যে এ প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন মেয়াদের বিভিন্ন কোর্স প্রদান করে। কিছুদিন আগে পর্যন্ত এনএইচটিআই ছিল একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যারা পর্যটন ও আতিথেয়তা কোর্স প্রদান করত। যা হোক, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ শিল্পের সম্প্রসারণের ফলে প্রশিক্ষিত মানব সম্পদের ঘাটতি দেখা যায়।

পর্যটনশিল্পের জন্য প্রশিক্ষিত কর্মীদের চাহিদা ও সরবরাহের ক্ষেত্রে এখনো একটি বড় ব্যবধান রয়ে গেছে, যা বিবেচনা করে দেশে সংক্ষিপ্ত কোর্স, ডিগ্রি এবং উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করার সুযোগ সম্প্রসারিত হয়েছে। বর্তমানে ৫০টিরও বেশি নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং কয়েকটি সরকারি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রতিষ্ঠান পর্যটন ও আতিথেয়তায় সার্টিফিকেট ও ডিপ্লোমা কোর্স প্রদান করে। উপরন্তু ছয়টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ ১৮টি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যটন ও আতিথেয়তায় বিবিএ ও এমবিএ প্রোগ্রাম প্রদান করছে। এখন পর্যন্ত শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এ বিভাগে পিএইচডি প্রোগ্রাম প্রদান করে।

পর্যটন পুলিশের সূচনা
পর্যটনকেন্দ্রে হয়রানি ও সন্ত্রাসবাদের ঘটনা বিশ্বে অস্বাভাবিক নয়। পর্যটকদের সাহায্য ও সুরক্ষার জন্য অনেক দেশই এখন পর্যটন পুলিশ ইউনিট চালু করছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং বাংলাদেশের পরিবেশ এবং সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের মাধ্যমে দেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে রক্ষা করতে ২০১৩ সালের ৬ নভেম্বর বাংলাদেশ পুলিশের একটি বিশেষ ইউনিট হিসাবে বাংলাদেশে ট্যুরিস্ট পুলিশ গঠন করা হয়।


দেশে পর্যটন পুলিশের অধীনে তিনটি জোনসহ দুটি প্রধান বিভাগ রয়েছে। প্রতিটি জোন বেশকিছু পর্যটনকেন্দ্র দেখাশোনা করে। বিভাগগুলো পুলিশ সুপার (এসপি) দ্বারা পরিচালিত হয় এবং জোন-অতিরিক্ত পুলিশ সুপারিনটেনডেন্টের (এডিএল এসপি) অধীনে, যেখানে প্রতিটি ট্যুরিস্ট স্পট সহকারী পুলিশ সুপারিনটেনডেন্টের (এএসপি) তত্ত্বাবধানে পড়ে।


বাংলাদেশ পর্যটন সম্পদে পরিপূর্ণ একটি রাষ্ট্র। ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বৈচিত্র্যের কারণে দেশে পর্যটনশিল্পের সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের অভ্যন্তরে পর্যটকদের ভ্রমণের জন্য পর্যটন স্পটের সম্প্রসারণ এবং বিদেশ থেকে আরও পর্যটক আকর্ষণের জন্য নীতিমালা তৈরিতে বাংলাদেশ অগ্রগতি করেছে। উপরন্তু সরকারের পর্যটন উন্নয়ন বিভাগ প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণের কাজ শুরু করেছে। অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে রয়েছে-ভ্রমণ প্রচার-প্রচারণা, ভিসা বিধি এবং আনুষ্ঠানিকতা, মানসম্পন্ন ট্যুর অপারেটর এবং পর্যটন গাইড পরিষেবার উন্নয়ন, পরিবহণ, বাসস্থান ও বিনোদনের জন্য উন্নত ব্যবস্থা। পর্যটন উন্নয়নে সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত থেকে বাংলাদেশকে শিক্ষা নিতে হবে, দেশের পর্যটন বোর্ড ও পর্যটন করপোরেশনকে বাস্তবসম্মত পর্যটন উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে এবং সময়মতো তা বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রয়োজন দেশের কার্যকর ব্র্যান্ডিং। স্মার্ট উপস্থাপকের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলায় অংশগ্রহণ করতে হবে এবং সচেতনতা বাড়াতে জনগণ ও গণমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে, পর্যটকদের স্বাচ্ছন্দ্য ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যাপক কাজ করা প্রয়োজন।

টার্গেট পর্যটক গ্রপ সংজ্ঞায়িতকরণ
এই গ্রুপগুলোর কোনটি কী ধরনের স্পট পছন্দ করে এবং কীভাবে পর্যটন কর্মকাণ্ডে তাদের সেবা করা যায় তা বিশ্লেষণ করতে হবে যেমন: ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, খাদ্য, কেনাকাটা ও ভ্রমণের ব্যবস্থা। পর্যটনশিল্পের সব স্টেকহোল্ডারের (স্থানীয়/গ্রামীণ সম্প্রদায়, উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী, সরকার, পর্যটক এবং অন্যান্য) চাহিদা ও স্বার্থ বিবেচনা করে পর্যটন গন্তব্যের উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনার জন্য কৌশল প্রণয়ন করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি উভয় প্রতিষ্ঠানের আতিথেয়তা সেবায় কর্মীদের গুণগত মান বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সরকার, নিয়োগকর্তা ও কর্মীদের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন আলোচনা এবং তথ্য আদান-প্রদানের সর্বোত্তম ব্যবহার এবং পর্যটন উন্নয়ন ইস্যুতে ঐকমত্য গড়ে তুলতে হবে। পর্যটন প্রচারের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ব্র্যান্ডিং। ব্র্যান্ডিং দুই প্রকার হতে পারে-একটি কান্ট্রি ব্র্যান্ডিং এবং অন্যটি ট্যুরিস্ট স্পট ব্র্যান্ডিং। বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ড ‘সুন্দর বাংলাদেশ’ নামক প্রচারাভিযান শুরু করেছে এবং আশা করা হচ্ছে যে, এ প্রচারাভিযানটি দেশটিকে একটি আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্য হিসাবে উন্নীত করবে এবং পর্যটকদের কাছে আরও ভালোভাবে পৌঁছাতে এবং তাদের বাংলাদেশ ভ্রমণে আকৃষ্ট করতে পর্যটন বিজ্ঞাপন ও গন্তব্য ব্র্যান্ডিংয়ের ওপর মনোযোগ প্রদান করতে হবে। পর্যটন পণ্যের উন্নয়নে আরও গবেষণা করতে হবে।

ড. সৈয়দ রাশিদুল হাসান : অধ্যাপক, মেরিটাইম ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি বিভাগ; বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়; সাবেক অধ্যাপক, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

স্বাধীনতার ৫১ বছরেও কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশা পূরণ হয়নি পর্যটনে
আয়ারল্যান্ডে ওয়ালটন স্মার্ট টিভিতে ব্যাপক সাড়া

আপনার মতামত লিখুন