শনিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ২ আশ্বিন ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
দেখা থেকে লেখা

কিংবদন্তির দিল্লির আখড়া

বেনজীর আহমেদ সিদ্দিকী
২৮ আগস্ট ২০২১

বেশ সকালে মিরপুর থেকে অটোরিকশায় চেপে সবাই রওনা হলাম হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ের কালাডুবার উদ্দেশে। কালাডুবায় পৌঁছে হাওরের পাশেই মায়ের দোয়া দোকানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম ও চা পান করতে করতে আগে থেকে ঠিক করে রাখা বজরা ঘাটে ভিড়ল। বজরায় উঠে সবাই বসামাত্রই মাঝি ইঞ্জিন চালু করে দিল। ঢেউয়ের তালে দুলতে দুলতে বজরা একসময় বিরতি নিল পলি পড়ে গড়ে ওঠা ঢিবির পাশে। এরপর যাত্রা শুরু করলাম বিথঙ্গল হাওরের উদ্দেশে। কিছুদূর যেতেই পরিস্কার সবুজ জলে পানকৌড়ির ডুবসাঁতার, ছোট মাছের লাফালাফি ও এদের পিঠে আলোর ঝলক দেখে মুগ্ধ হলাম। ঝুমুর দিদি বাসা থেকে বড় এক টিফিন বক্স ভরে পায়েস, দই ও পিঠা এনেছিলেন। ছইয়ের নিচে বসে ঢেউ আর বিস্তৃত জলরাশি দেখতে দেখতে তা উপভোগ করলাম। এভাবে ঢেউয়ের তালে দুলতে দুলতে দুপুরের দিকে এসে পৌঁছালাম অনেক প্রাচীন বিথঙ্গল আখড়ার ঘাটে।

হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলায় বিথঙ্গল গ্রামে বিথঙ্গল বড় আখড়া বা বিথঙ্গল আখড়ায় দুপুরে পৌঁছে প্রখর রোদের মাঝে পড়লাম। মধ্যযুগীয় স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত আখড়াটির সৌন্দর্য উপভোগ করতে লাগলাম। আখড়ার একজন সেবক জানালেন বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত এই আখড়া। রামকৃষ্ণ গোস্বামী উপমহাদেশের বিভিন্ন তীর্থস্থান সফর শেষে ষোড়শ শতাব্দীতে বিথঙ্গল গ্রামে এসে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রায় ৫০০ বছর পূর্বে ত্রিপুরার রাজা উচ্চবানন্দ মানিক্য বাহাদুর প্রাচীন নির্মাণ কৌশলসমৃদ্ধ দুটি ভবন নির্মাণ করে দেন এবং মানিক্য বাহাদুর ও তার স্ত্রী এতে প্রায়ই এসে অবস্থান করে ধর্মকর্ম করতেন। মধ্যযুগীয় স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত বিথঙ্গল বড় আখড়ায় ১২০ জন বৈষ্ণবের জন্য পৃথক কক্ষ রয়েছে। এখানে যথাযোগ্য ভাবগাম্ভীর্যের মাধ্যমে বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব আয়োজন করা হয়ে থাকে। বিভিন্ন উৎসবের মধ্যে আছে আষাঢ় মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে রথযাত্রা, ফাল্কগ্দুন মাসে দোল পূর্ণিমার পাঁচ দিন পর পঞ্চম দোল উৎসব, কার্তিক মাসের শেষ দিনে ভোলা সংক্রান্তিতে কীর্তন, চৈত্রের অষ্টমী তিথিতে পুণ্যস্নান ও বারুণী মেলা ইত্যাদি। বিথঙ্গল আখড়ার পাশেই হাওরের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা একটা খাবারের দোকানে ছোলা ভুনা, মিষ্টি ও দই-চিড়া খেয়ে আবারও নৌকায় উঠলাম। উদ্দেশ্য কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার শেষ প্রান্তে অবস্থিত দিল্লির আখড়া।

লক্ষ্মীর বাঁওড় পেরিয়ে পৌঁঁছে গেলাম প্রাচীন এই আখড়ায়। এই স্থানটি দিল্লির সম্রাট জাহাঙ্গীরের বদান্যতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তাই এমন নামকরণ হয়েছে বলে জানা যায়। প্রায় ৪০০ বছর আগের এক মিথ নিয়ে স্থানটি আজও ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। আখড়ার চারপাশে আছে অসংখ্য হিজলগাছ আর এই গাছগুলো এখানকার প্রচলিত মিথের অংশ। প্রায় ৩৭২ একর জমি নিয়ে গড়ে ওঠা আখড়াটি নারায়ণ গোস্বামীর হাতে প্রতিষ্ঠিত। হিজল আর হাওরের সৌন্দর্যে চমৎকার একটি স্থান এই দিল্লির আখড়া।

প্রায় ৪০০ বছর আগে এই জায়গাটির পাশ দিয়ে দিল্লির সম্রাট প্রেরিত একটা কোশা নৌকা মালপত্রসহ ডুবে যায় এবং একজন সাপের কামড়ে মারা যায়। এ কথা শুনে পার্শ্ববর্তী বিথঙ্গল আখড়ার গুরু রামকৃষ্ণ গোস্বামী তার শিষ্য নারায়ণ গোস্বামীকে এখানে পাঠান। টানা সাত দিন তিনি এখানে রহস্যজনক নানা শক্তির সম্মুখীন হন এবং পরে এখানে বসবাস করা অসংখ্য দানব মূর্তিকে আধ্যাত্মিক শক্তিবলে হিজলগাছে রূপান্তর করেন। আর সম্রাটের ডুবে যাওয়া নৌকাটিও উদ্ধার করে দেন। খুশি হয়ে সম্রাট জায়গাটি আখড়ার নামে দান করে দেন। সম্রাট জাহাঙ্গীর ১২১২ সালে আখড়ার নামে একটি তামার পাত্রে ওই জমি লিখে দেন। কিন্তু ১৩৭০ সালে ডাকাতরা তা নিয়ে পালিয়ে যায়।

এসব প্রাচীন আখ্যান ভাবতে ভাবতে আখড়ার ভবন, গাছে অজস্র পানকৌড়ি ও বকের বাসা, বাচ্চাকে খাওয়ানোর দৃশ্য, ভিন্ন ভিন্ন আকৃতির সারি সারি হিজল আবৃত পরিবেশ উপভোগ করতে লাগলাম। হাঁটতে হাঁটতে আখড়ার এক পাশে দেখলাম মার্বেলের মতো মাটির গোল গোল বল শুকাতে দেওয়া আছে। এখানকার ভক্তরা বিশ্বাস করে আখড়ার মাটির এই মার্বেল খেলে নাকি নানা রোগবালাই থেকে মুক্তি পাওয়া যায় এবং মনের ইচ্ছা পূর্ণ হয়। তাই পুরোহিতদের হাতে গড়া ও তন্ত্রমন্ত্র পাঠ করে ফুঁ দিয়ে দেওয়া এসব মাটির মার্বেল এই আখড়ার ভক্তরা বিশ্বাস নিয়ে খায় এবং বাড়িতে রাখে। 'বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর'- আমার মস্তিস্কের যুক্তির জায়গায় বারবার ঘোরা শুরু হলো এবং বিভিন্ন বিষয় ভাবতে ভাবতে আখড়ার ভেতরে দেখে ফেললাম আধ্যাত্মিক সাধক নারায়ণ গোস্বামী ও তার শিষ্য গঙ্গারাম গোস্বামীর সমাধি, ধর্মশালা, নাটমন্দির, অতিথিশালা, পাকশালা ও বৈষ্ণবদের থাকার ঘর এবং আখড়ার দু'দিকের দুটি পুকুর। প্রতি বছর চৈত্র মাসে এখানে মেলা বসে। মেলাকে কেন্দ্র করে আশপাশের নানা অঞ্চলের মানুষের সমাবেশ দেখা যায়। এ ছাড়া প্রতি অমাবস্যা এবং পূর্ণিমার রাতে এখানে ভোগ দেওয়া হয়।

হিজলের বনে তখন সূর্য তার শেষ আলো দিয়ে ডুবে যেতে শুরু করেছে। আমরা সারাদিনের অজস্র ভালো লাগার অনুভূতি নিয়ে বজরায় চেপে হবিগঞ্জে ফেরার জন্য রওনা হলাম। ফেরার পথে বজরার ছাদে শুয়ে আকাশের নানা রং বদল দেখা এবং হঠাৎ নেমে আসা ঝিরিঝিরি বৃষ্টি অপার্থিব অনুভূতি দিয়েছিল।

যেভাবে যাবেন: বছরের বিভিন্ন সময়ে বিথঙ্গল ও দিল্লির আখড়ায় যাওয়া গেলেও বর্ষা ও শরতের শেষ অবধি বা যতদিন হাওরে পানি থাকে ততদিন পর্যন্ত এখানে যাওয়ার শ্রেষ্ঠ সময়। ঢাকার সায়েদাবাদ বা মহাখালী থেকে বাস যায় হবিগঞ্জে। সকাল সাড়ে ৬টা থেকে শুরু করে আধা ঘণ্টা-এক ঘণ্টা পরপর বাস ছেড়ে যায়। চাইলে রাতের উপবন ট্রেনে চলে যেতে পারেন। রাত ১০টায় উপবন ছাড়ে এবং শায়েস্তাগঞ্জ থামে রাত ৩টায়। সেখান থেকে অটোতে হবিগঞ্জ। হবিগঞ্জ শহরে এসে সেখান থেকে কালাডুবা ঘাট যাওয়ার জন্য অটোরিকশায় উঠতে হবে। এই ঘাট থেকে দরদাম করে বিথঙ্গল যাওয়ার ট্রলার বা বজরা ভাড়া করে ভেসে চলুন হাওরের সবুজ জলে। চাইলে কিশোরগঞ্জের ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম, নিকলী বা বাজিতপুর থেকেও যাত্রা করতে পারেন। সময় দুই ঘন্টা লাগবে। তবে যেভাবেই আসেন হাওরের সৌন্দর্য আপনাকে বারবার টেনে নেবেই।

অপরূপ সোনাদিয়া দ্বীপ
হারিয়ে যাওয়া এক শহর

আপনার মতামত লিখুন