বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২০ | ২৫ আষাঢ় ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
সীমানার ওপারে

যেভাবে ব্যবসায় ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে থাই পর্যটন শিল্প

অনলাইন ডেস্ক
০১ জুন ২০২০

থাইল্যান্ডে ধীরে ধীরে সচল হতে শুরু করেছে পর্যটন শিল্প। করোনা ভাইরাস (কভিড-১৯) সংক্রমণ রোধে জারি লকডাউনে স্থবির হয়ে পড়েছিল দেশটির অর্থনীতির অন্যতম এই চালিকাশক্তি। দীর্ঘ সময় শেষে ফের তা সক্রিয় হয়ে উঠছে। রাজধানী ব্যাংককের ফুলসজ্জ্বিত এরাওয়ান মঠে মাথায় রত্নখচিত টুপি পড়ে নারীরা আগের মতো নাচতে শুরু করেছে। তবে এখন অন্যান্য প্রসাধনীর পাশাপাশি তাদের মুখে শোভা পাচ্ছে প্লাস্টিকের শিল্ড। মঠের কাছেই অবস্থিত আনানতারা সিয়াম ব্যাংকক হোটেলও খোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কর্মীদের কক্ষ যথাযথভাবে পরিষ্কার রাখা, হাসপাতাল-গ্রেডের জীবাণুনাশক ব্যবহার করার প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। রিসেপশনের কাউন্টারে স্থাপন করা হয়েছে গ্লাসের শিল্ড।

চেয়ার-টেবিল পর্যাপ্ত দূরত্ব বজায় রেখে সাজানো হয়েছে। হোটেলে আগমনকারীরা চেক-ইন করতে কোথায় অপেক্ষা করবে তা চিহ্নিত করে দেয়া হয়েছে।

চীনের পর দ্বিতীয় দেশ হিসেবে করোনার সংক্রমণ চিহ্নিত হয়েছিল থাইল্যান্ডে। বিশ্বের মধ্যে লকডাউন তুলে নেয়া বিবেচনায়ও তালিকার শুরুর দিকে অবস্থান করছে দেশটির নাম। মাস্টারকার্ডের গ্লোবাল ডেস্টিনেশন সিটিজ ইনডেক্স অনুসারে, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মানুষ সফরকারী শহর হচ্ছে ব্যাংকক। মাইনর হোটেলস, সানসারি ও হাই লাইনের মতো বিশ্বের সবচেয়ে বড় বড় হসপিটালিটি বিষয়ক প্রতিষ্ঠানের হোটেল রয়েছে সেখানে। আর তাই, থাইল্যান্ডে যা হচ্ছে তা পুরো বিশ্বের জন্য নির্দেশক হিসেবে কাজ করতে পারে।

সানসিরির প্রেসিডেন্ট ও স্ট্যান্ডার্ড হোটেলসের চেয়ারম্যান শ্রেথা থাভিসিন বলেন, এই আঘাতের পূর্বে পর্যটন তরতর করে বেড়ে উঠছিল; আমেরিকান, ইউরোপিয়ান, চীনা, ভারতীয় সহ সকল দেশবাসীর জন্য এটা ছিল এক স্বর্গ। সকলে থাইল্যান্ড পছন্দ করতো। আমার ধারণা, এই সংকট শেষে মানুষজন ফের এখানে ফিরে আসতে নিরাপদ বোধ করবে। হয়তো তৃতীয় প্রান্তিকে সব স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে।

সমুদ্র সৈকত থেকে শুরু করে চায়নাটাউনের খাবার, কুস্তি ম্যাচ, জঙ্গলে ট্রেকিং, শরীর মালিশ সহ অসংখ্য অভিজ্ঞতার জন্য বিশ্বজুড়ে প্রসিদ্ধ থাইল্যান্ড। বিশাল এই পর্যটন শিল্প ধীরে ধীরে সচল হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এসব মাস্ক, তাপমাত্রা মাপা, হ্যান্ড স্যানিটাইজার পর্যটকদের উপভোগের মেজাজ নষ্ট করে দেবে না তো?

গত বছর থাইল্যান্ডে ভ্রমণকারীর সংখ্যা ছিল ৩ কোটি ৯০ লাখ। দেশটির পর্যটন কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা চলতি বছর সে সংখ্যা নেমে ১ কোটি ৬০ লাখে নেমে আসতে পারে। অনেকের মতে, সে সংখ্যা ১ কোটিরও কম হতে পারে। হোটেল ও রেস্তোরার মালিকদের দাবি, পর্যটকরা ভ্রমণে গিয়ে আগের পরিবেশই পাবেন। সাথে যোগ করা হবে নতুন অনেক কিছু। সংস্পর্শহীন প্রযুক্তি, যেমন কার্ড, টাচ-ফ্রি বাটন, এমনকি ফেস রিকগনিশন প্রযুক্তিও যোগ হতে পারে।

হোটেলগুলোর যেসব অংশ সকলের জন্য উন্মুক্ত সেগুলো নতুন করে সাজানো হচ্ছে। আলো-বাতাসের উপস্থিতি বৃদ্ধির চেষ্টা করছেন কর্তৃপক্ষরা। সকালের নাস্তা এখন থেকে দেয়া হবে টেবিলে, আগের মতো বুফে ব্যবস্থা হ্রাস পাবে। হোটেলের কর্মচারীদের মুখে থাকবে মাস্ক। তাদের হাসি ঢাকা পড়ে যাবে সে মাস্কের আড়ালে। হাতে থাকবে গ্লভস।

মাস্ক ও গ্লভস চোখে না লাগলেও, ফেস শিল্ড দেখতে সুশ্রী নয়। থাভিসিনের ভাষ্যমতে, ফেস শিল্ডগুলো একধরণের দুঃস্বপ্নের মতো। তিনি তাদের করপোরেট ডিজাইনারদের এই শিল্ডগুলো আকর্ষণীয় করে তুলতে নির্দেশ দিয়েছেন। তার প্রতিষ্ঠানের মতো আরো অনেকেই একই সমস্যার সম্মুখীন। মিশেলিন তারকাপ্রাপ্ত রেস্তোরাঁ পেস্টের মালিক ও প্রধান শেফ বংকক্স বি সাতনগান বলেন, প্লাস্টিকের তৈরি শিল্ডগুলো দেখতে অনেকটা নভোচারীদের মতো লাগে। আমরা এ ব্যাপারে কী করবো সে বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারিনি।

সাধারণত এশিয়ায় পর্যটকরা এক জায়গায় বেশিদিন অবস্থান করেন না। তবে এখন থেকে লম্বা পরিকল্পনা নিয়ে ভ্রমণকারীরা এক জায়গায়ই অবস্থান করতে চাইবেন। এদিক বিবেচনায়, প্রাইভেট ভিলাগুলো হোটেলের চেয়ে বেশি অগ্রাধিকার পাবে পর্যটকদের কাছে। হাসপাতালের সমমানের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, পরিচ্ছন্নতা ও মানুষের সঙ্গে সংস্পর্শ কমানো প্রাধান্য পাবে হোটেল ও ভিলা কর্তৃপক্ষের কাছে। এসব এখন থেকে অনেকটা সেবার অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে। ব্যাংকক হোটেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক থমাল হারল্যান্ডার বলেন, আগের মতো পারসোনালাইজেশন থাকলেও অতিথিদের সঙ্গে কর্মচারীদের সাক্ষাৎ কমে যাবে। আনানতারা হোটেল কর্তৃপক্ষ তাদের অতিথিদের ব্যক্তি পর্যায়ে ব্যায়ামগারের সুবিধা দেয়ার কথা চিন্তা করছে। পাল্টে যাবে রুম সার্ভিসের ধরণও। এখন থেকে হোটেলের কর্মচারীরা আর অতিথিদের কক্ষে ঢুকবে না। দরজার সামনেই ট্রলিতে করে সব পৌঁছে দেবে।

থাই কর্তৃপক্ষরা চলতি মাসের শুরু থেকেই লকডাউন পর্যায়ক্রমে শিথিল করছে। প্রথমে খুলে দেয়া হয় রেস্তোরাঁ, এরপর কিছু প্রদেশে খোলার অনুমোদন দেয়া হয় হোটেলগুলোকে। আজ রোববার থেকে খুলে দেয়া হয়েছে শপিংমলগুলোও। ধীরে ধীরে আগের ছন্দে ফিরে যাচ্ছে দেশটি। এখন পর্যন্ত সেখানে করোনায় নিশ্চিত আক্রান্ত হয়েছেন অন্তত ৩ হাজার ২৮ জন। মারা গেছেন ৫৬ জন।

গত বছর থাইল্যান্ডে রেকর্ড পরিমাণ মানুষ ভ্রমণ করে। অনেক সৈকতে মাত্রাতিরিক্ত মানুষের ভীড় হওয়ার অভিযোগ উঠে। সাধারণত পর্যটক সংখ্যা বাড়াতে কাজ করা পর্যটন কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা বিভাগ তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। বর্তমানে, দুই মাস লকডাউনে থাকার পর, কয়েক বছর আগের রূপ ফিরে পেয়েছে দেশটির সমুদ্র সৈকতগুলো। দেখা দিয়েছে অনেক বিলুপ্তপ্রায় বন্যপ্রাণীও। পর্যটকদের চাপে কাহিল হয়ে পড়া পার্ক, সমুদ্র, দ্বীপগুলো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য ফিরে পেয়েছে। কিন্তু হোটেল ও রেস্তোরাঁর মালিকদের জন্য হতাশার খবর হচ্ছে, এসব বেশিরভাগ জায়গায় ভ্রমণ এখনো নিষিদ্ধ। চলতি মাসের শেষ পর্যন্ত বন্ধ থাকবে বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক ফ্লাইটও। থাই হোটেল গ্রুপগুলো জানিয়েছে, তাদের প্রত্যাশা, তিন ধাপে ব্যবসা আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। স্থানীয়দের দিয়ে ভ্রমণ শুরু হবে। তাদের আকর্ষণ কাড়তে নানা প্যাকেজ চালুর কথা ভাবা হচ্ছে।

এদিকে, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো যেসব দেশে করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে সেসব দেশের উপর থেকে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা শিথিলের কথা ভাবছে থাই কর্তৃপক্ষ। এই সম্ভাব্য পর্যটনকারীদেরই ব্যবসা চালুর দ্বিতীয় ধাপের গ্রাহক ভাবছে হোটেল কর্তৃপক্ষগুলো। তাদের ধারণা, লকডাউন থেকে সদ্য-মুক্ত হওয়া চীনারা ভ্রমণে ইচ্ছুক হবেন। দুসিত ইন্টারন্যাশনালের প্রধান নির্বাহী জানান, চীনারা যদি ভ্রমণ করা শুরু করে, তাহলে তাদের অন্যতম গন্তব্যস্থান হবে থাইল্যান্ড। থাইল্যান্ডের এই গ্রুপটির ১২টি হোটেল রয়েছে। হোটেলগুলো ব্যবসায় ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তৃতীয় ও চূড়ান্ত ধাপটি শুরু হবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকে দীর্ঘমেয়াদী ফ্লাইট চালু হলে। বছরের শেষের দিকে এমনটা হওয়ার কথা রয়েছে।

সবকিছু বিবেচনায় নতুন রূপে ব্যবসায় ফিরতে প্রস্তুতি নিচ্ছে থাই পর্যটন খাত। সানসিরি তাদের হোটেলগুলো নতুন করে সাজাচ্ছে। আলো-বাতাসের উপস্থিতি বৃদ্ধি করায় জোর দিচ্ছে। একই ডিজাইন অনুসরণ করছে অন্যান্য গ্রুপগুলোও।

স্ট্যান্ডার্ড হোটেলসের চেয়ারম্যান শ্রেথা থাভিসিন বলেন, অপরিচিতদের কাছাকাছি থাকার ধারণা আর আগের মতো আকর্ষণীয় থাকবে না। হোটেলে প্রবেশমাত্রই অতিথিদের হয়তো তাদের পা পরিষ্কারের জন্য জীবাণুনাশক দেয়া হবে বা আলট্রাভায়োলেট রশ্মি দিয়ে তাদের ‘পরিষ্কার’ করা হবে।

(দ্য ফিন্যান্সিয়াল টাইমসে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সংক্ষেপিত অনুবাদ। মূল প্রতিবেদনটি লিখেছেন, গণমাধ্যমটির ব্যাংকক ব্যুরো প্রধান ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া করেসপন্ডেন্ট জন রিড।)

করোনা আক্রান্ত পর্যটন শিল্প
করোনা হলে পর্যটকদের খরচ বহন করবে সাইপ্রাস

আপনার মতামত লিখুন