শনিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ২ আশ্বিন ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
সীমানার ওপারে

নৈসর্গিক প্রিন্সেস আইল্যান্ডস

ড. ডি. এম. ফিরোজ শাহ্‌
২৮ আগস্ট ২০২১

ইস্তাম্বুল পাহাড়ি শহর। পাহাড়ের ঢাল ব্যবহার করে রাস্তা, ভবন, ট্রাম লাইন, রেলপথ নির্মাণ করা হয়েছে। আজ যাব 'দ্য প্রিন্সেস আইল্যান্ডস'। সকাল ১০টার পর আমার গাইড এবং হোস্ট শাহাদাৎ ভাইর ডেরা আলিবাইকোই থেকে শাহীনসহ বের হলাম। ট্রামে চড়ে গোল্ডেন হর্নের কাছে ব্যস্ততম ফেরিস্টেশন কাবাতাস গেলাম। এখান থেকে সরকারি ও বিভিন্ন ট্যুর কোম্পানির ফেরি/ওয়াটার বাস যায় দ্য প্রিন্সেস আইল্যান্ডস। তুরস্কের বৃহত্তম শহর ইস্তাম্বুল গিয়ে এই আইল্যান্ডে না গেলে সফর অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। চেক ইন করে ভেতরে প্রবেশ করে ঘাটেই ফেরি পাওয়া গেল। সুন্দর, সুশ্রী আধুনিক ফেরিবোটটি দোতলা ও লম্বাটে। ফেরির ছাদে খোলা স্থানে কাঠের বেঞ্চ পাতা, মজবুত রেলিং। আমরা কাঠের বেঞ্চে বসলাম। নানা দেশের নানা কিসিমের মানুষ। কেউ পরেছেন স্যুট-বুট, কেউ ক্যাজুয়াল। আবার কারও শরীরের ওপর-নিচ প্রায় উদোম। এত অমিলের ভিড়ে মিল একটাই- সবাই পর্যটক। বহু দূর থেকে, বহু ব্যয় করে প্রকৃতি, ইতিহাস, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য দর্শনে তারা এসেছেন।

ভেঁপু বাজিয়ে ফেরি ছেড়ে দিল মারমারা সাগরের বুকে। ফেরির ছাদে দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকিয়ে মুগ্ধ বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেলাম। আহ্‌, পৃথিবী এত সুন্দর!

বসফরাস প্রণালি বামে রেখে আমরা চললাম মারমারা সাগরের দিকে। বসফরাস প্রণালি কৃষ্ণ সাগর ও মারমারা সাগরকে যেমন যুক্ত করেছে; তেমনি ইস্তাম্বুল শহরকে এশীয় ও ইউরোপীয় এ দুই অংশে বিভক্ত করেছে। বসফরাস প্রণালির একটি সরু শাখা ইস্তাম্বুল শহরের ইউরোপীয় অংশ দিয়ে ভূ-ভাগে ঢুকে গেছে, যার নাম গোল্ডেন হর্ন। এর ওপর গালাতা ব্রিজসহ একাধিক ব্রিজ দিয়ে দুই অংশকে সংযুক্ত করা হয়েছে, যার একাংশে রয়েছে ব্যস্ততম সিনুমিনু এলাকা, অপর অংশে ঐতিহাসিক গালাতা টাওয়ার ও তাকসিম স্কয়ার। অন্যদিকে ইস্তাম্বুল শহরের এশীয় অংশকে যুক্ত করেছে দীর্ঘ দুটি ঝুলন্ত ব্রিজ ও দুটি টানেল। রোদের আলো খুব মিষ্টি লাগছে। কাবাতাস ঘাট থেকে ফেরি ছাড়তেই বামে চোখে পড়ল 'দি মেইডেন টাওয়ার' ও ডানে বিখ্যাত 'ব্লু মসজিদ'। পুরো তুরস্কে রয়েছে নানা ঐতিহাসিক, ধর্মীয়, প্রাকৃতিক ও প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শন। বসফরাস প্রণালির মধ্যে ইস্তাম্বুলের এশীয় অংশের উসকাদর উপকূল থেকে ২২০ মিটার দূরে এর অবস্থান। একটি গভীর প্রণালির মধ্যে ১৮ মিটার টপ ফ্লোর, ১৮ মিটার টিপ ও ১৮ মিটার আর্কিটেকচারাল ডিজাইনের এ ভবনটি ১৭২৫ সালে আর্কিটেক্ট ইব্রাহিম পাশার তত্ত্বাবধানে তৈরি হয়েছে। তবে এর ইতিহাস নিয়ে খিষ্টপূর্বকাল থেকেই নানা মিথ বা কাহিনি প্রচলিত।

আমাদের ফেরি সামনে এগিয়ে মারমারা সাগরে পড়ল। বামদিকে ইস্তাম্বুল শহরের এশীয় অংশ, ডানদিকে দিগন্ত বিস্তৃত মারমারা সাগর। জাহাজের দোতলায় বসার ব্যবস্থার পাশাপাশি রয়েছে একটি ছোট 'টি স্টল'। আমরা তুর্কি 'চা-য়ে' অর্থাৎ রং চা নিলাম। কাচের স্বচ্ছ গ্লাসে রং চায়ের রং দেখতে আকর্ষণীয় মনে হয়।

মারমারা সাগরের মধ্য দিয়ে দ্রুতগামী জাহাজটি এগিয়ে চলল দ্বীপের দিকে। ওপরে সুবিশাল নীলাকাশ, নিচে সুবিস্তৃত নীল জলরাশি। একের পর এক ফেরি চলাচল করছে। সবই লম্বাটে। মাঝেমধ্যে দু'একটি মালবাহী জাহাজ চোখে পড়ে। বামদিকে যতদূর চোখ যায়, ইস্তাম্বুলের এশীয় অংশে সুউচ্চ দালান আর দালান। আমাদের জাহাজ উপকূল থেকে অনেকটা দূর দিয়ে যাওয়ায় সব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না।

দ্য প্রিন্সেস আইল্যান্ডসে মোট দ্বীপ ৯টি। এর মধ্যে ৪টি বড় ও জনবসতি রয়েছে; অবশিষ্ট ৫টি দ্বীপ ছোট এবং বসতিহীন। বড় দ্বীপটির নাম বুয়োকাদা; আয়তন ৫ দশমিক ৪৬ বর্গকিলোমিটার। দ্বিতীয়টির নাম হেবিলিয়াদা; আয়তন ২ দশমিক ৪ বর্গকিলোমিটার। তৃতীয়টির নাম বুর্গাজাদা; আয়তন ১ দশমিক ৫ বর্গকিলোমিটার এবং চতুর্থটির নাম কিনালিয়াদা; আয়তন ১ দশমিক ৩ বর্গকিলোমিটার। অবশিষ্ট ৫টি ছোট দ্বীপ হলো- সেদেফ আদাসি, ইয়াসিয়াদা, সিভিয়াদা, কাসিক আদাসি এবং টাফসান আদাসি।

ঘণ্টাখানেক ফেরি চলার পর প্রথমে ছোট দ্বীপগুলো নজরে এলো। ফেরি প্রথমে হেবিলিয়াদাতে ভিড়লে কিছু লোক ওঠানামা করল। এখানে একবার ফেরির রাউন্ড টিকিট কিনলে যে কোনো ফেরিতে যে কোনো সময় আসা-যাওয়া করা যায়। এক দ্বীপ ভ্রমণ করে অন্য দ্বীপেও যাতায়াত করা যায়। এ জন্য আর বাড়তি টিকিট লাগবে না। আমরা বড় দ্বীপ বুয়োকাদা নেমে গেলাম। পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন দীর্ঘ জেটি সমুদ্রের ভেতর অনেকটা জিহ্বার মতো ঢুকে গেছে। ইস্তাম্বুল থেকে এই দ্বীপে আসা পর্যন্ত যতটুকু চোখে পড়েছে, উপকূলভাগে খুব শক্ত করে বাঁধ দেওয়া হয়েছে। এ জন্য বিশাল বিশাল পাথরের টুকরা ব্যবহার করা হয়েছে, যেগুলো সমুদ্রের ঢেউয়ে খুব ক্ষয় হয়নি। আসলে দীর্ঘ পরিকল্পনা ও মানসম্মত নির্মাণকাজ না হলে উন্নতি করা যায় না। আমরা বুয়োকাদা দ্বীপের ভেতর প্রবেশ করলাম। সুপরিকল্পিতভাবে সাজানো সব। মাত্র সাড়ে পাঁচ বর্গকিলোমিটারের একটি ছোট দ্বীপ, সোনার চেয়ে দামি প্রতি ইঞ্চি মাটি। এখানে সব ধরনের যান্ত্রিক যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ। দ্বীপ ভ্রমণের প্রধান উপায় হাঁটা। তবে বাইসাইকেল, ঘোড়া ও ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া পাওয়া যায়।

চোখ আটকে গেল আধুনিক তুরস্কের জনক কামাল আতাতুর্কের একটি আবক্ষ সোনালি মূর্তিতে। শ্বেত মার্বেল পাথরের বেদিতে রাস্তার পাশে এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছে যাতে সবার দৃষ্টি কাড়ে। বেদির প্রতি সোপানে রয়েছে ফুলের কেয়ারি। রাস্তার দু'পাশে নানা প্রকার ফুলগাছে থোকা থোকা ফুল ফুটে আছে। দ্বীপের তীর ঘেঁষে সরু প্যাসেজে রেস্টুরেন্ট। বিশাল রঙিন ছাতার নিচে নান্দনিক চেয়ার-টেবিল পাতা। আমরা খাওয়ার চেয়ে দেখার প্রতি বেশি জোর দিলাম। হেঁটে দ্বীপের ভেতরে গেলাম। এখানে কিছু খাবারের দোকান আর বেশিরভাগ স্যুভেনির শপ। দ্বীপের এ অংশের পর রয়েছে হোটেল-মোটেল-কটেজ। এখানে থাকা-খাওয়া খুব ব্যয়বহুল। এই দ্বীপ এক দিনে দামি হয়ে ওঠেনি। এগুলো ছিল মৎস্যজীবীদের আবাসভূমি। মারমারা সাগরে জেলেরা মাছ ধরে এখানে বিশ্রাম নিত। বাইজেনটাইন আমলে রাজপুত্র এবং রাজন্যবর্গ এবং পরবর্তীকালে অটোমান শাসনামলে সুলতানদের পরিবারের অনেককে এখানে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল। তাদের নামানুসারে এই দ্বীপের নাম হয় দ্য প্রিন্সেস আইল্যান্ডস। ১৪৫৩ সালে কনস্টান্টিনোপলস অবরোধকালে রাজপুত্রদের নির্বাসনে পাঠানো হয়। তবে উনিশ শতকে এই দ্বীপগুলো জনপ্রিয় হতে থাকে এবং ভিক্টোরিয়া যুগে অনেক কটেজ নির্মাণ করা হয়। প্রখ্যাত রাশিয়ান লেখক লিও ট্রটস্কিকে ১৯২৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই দ্বীপে নির্বাসন দেওয়া হয়েছিল। তিনি ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত এখানে নির্বাসিত ছিলেন।

বুয়োকাদা দ্বীপের ভেতরের কিছু অংশ ও উপকূলীয় এলাকায় দীর্ঘক্ষণ হেঁটে আমরা ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত হয়ে গেলাম। রেস্টুরেন্টের খাবার ব্যয়বহুল। হোস্ট শাহাদাৎ ভাইর পরামর্শে সবাই মিলে জুস-চিপস-নাট দিয়ে লাঞ্চ সেরে নিলাম।

বেলা পড়ে আসছে, কিন্তু দ্বীপ ছেড়ে যেতে মন চাইছে না। বুয়োকাদা দ্বীপে জেটির সঙ্গে অনেক ইয়ট নোঙর করা। রাজকীয় চেহারা দেখলেই বোঝা যায়, এগুলো অনেক দামি। বিকেলে ফিরতি জাহাজে চড়ি ইস্তাম্বুলের উদ্দেশে। এবারের জাহাজ একটু অন্যরকম। দীর্ঘ ডেকে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হই সি-গালের খেলা দেখে। সি-গালগুলো উড়ে এসে যাত্রীদের হাত থেকে ঠোকর দিয়ে খাবার নিয়ে যাচ্ছে। ওরা একটা নয়, সংখ্যায় অনেক। পর্যটকরা আনন্দিত হয়ে বাদাম, চিপস, পপকর্ন ও পাউরুটি ছিঁড়ে দিচ্ছে। পাখিদের আচরণ ও সাহস দেখে মনে হলো, এতে ওরা অভ্যস্ত। ইস্তাম্বুল থেকে সকাল বেলা যখন দ্বীপের দিকে যাই, সূর্যালোকে চারদিক ছিল আলোকোজ্জ্বল। এখন সে চিত্র পাল্টেছে। ধোঁয়াশা হচ্ছে চারপাশ, ফিকে হচ্ছে দালানকোঠা। মারমারা সাগর অতিক্রম করে শহরের উঁচু দালানে আস্তে আস্তে ডুবে যাচ্ছে সূর্য। সূর্যরশ্মির শেষ আলোকচ্ছটা আছড়ে পড়ছে সমুদ্রের জলে। আকাশে মেঘের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে নানা রঙের আলপনা। এত আয়োজন শেষ হয়ে যাবে কিছুক্ষণ পরে- ভাবতেই মন খারাপ হলো। সূর্য ডোবার সামান্য আগেই ভেঁপু বাজিয়ে জাহাজ ভিড়ল কাবাতাস জেটিতে। া

লেখক: সদস্য, বাংলাদেশ ট্রাভেলস রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন

মাওয়ায় প্রজেক্ট হিলসা
অপরূপ সোনাদিয়া দ্বীপ

আপনার মতামত লিখুন