সোমবার, ২৪ জানুয়ারি ২০২২ | ১১ মাঘ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
দেখা থেকে লেখা

নানিয়ারচরে একদিন

মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম
০৫ জানুয়ারি ২০২২
ছবি: লেখক

ছবি: লেখক

কাপ্তাই লেকের নীলাভ পানিতে ট্রলার চলছে ভেসে ভেসে। ছোট্ট ডিঙিতে চড়ে জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য যেন, নিজেদের যাপিত জীবনের প্রতি আনে তৃপ্তি

হুটহাট সিদ্ধান্ত, প্রিয় বিদ্যাপীঠ সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের বন্ধুরা মিলে রাঙামাটি যাব। যেমন কথা তেমন কাজ। রাতের বাসেই চড়ে সকালে গিয়ে নামলাম। এবারের ভ্রমণ ছিল অনেকটা উদ্দেশ্যহীন। মানে রাঙামাটি যাওয়ার পর কী দেখব, কোথায় কোথায় যাব। আমি যেহেতু দে ছুট ভ্রমণ সংঘের একজন। তাই বন্ধুদের মানসিক চাপ তেমন ছিল না। কিন্তু আমার তো ছিল। কারণ অনেকেরই রয়েছে আমার প্রতি বিশেষ ভরসা। কী আর করা। তাই মনে মনে নানিয়ারচরের প্ল্যানটা করেই রাখতে হয়েছিল। বাসস্ট্যান্ড থেকে নাশতা সেরে ট্রলারে চেপে বসলাম। গন্তব্য প্রথমে বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মুন্সী আব্দুর রউফের সমাধিস্থল। কাপ্তাই লেকের নীলাভ পানিতে ট্রলার চলছে ভেসে ভেসে। বন্ধুদের হাস্যরসাত্মক কথার ফাঁকফোকরে লেক ঘিরে থাকা পাহাড়ের সৌন্দর্যের প্রতি বিমুগ্ধ নয়নে চেয়ে রই। ছোট্ট ডিঙিতে চড়ে জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য, নিজেদের যাপিত জীবনের প্রতি তৃপ্তি আনে। ভ্রমণ শুধু বিনোদন নয়; শিক্ষা লাভেরও উপযুক্ত মাধ্যম। 

প্রায় ঘণ্টা দুই পরে দেখা মেলে জাতির সূর্যসন্তান পাকিস্তানি হানাদারদের মর্টার শেলের আঘাতে নিহত বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মুন্সী আব্দুর রউফের সমাধিস্থলের স্মৃতির মিনার। স্বাধীনতার সংগ্রামে বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আব্দুর রউফের বীরত্ব সম্পর্কে জানা আমার। তাই শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে আসে। শরীরের ভেতর আনমনেই রক্ত টগবগিয়ে ওঠে। ট্রলার ভিড়ে কবরস্থানের ঘাটে। একে একে সবাই নেমে জিয়ারত করি। চেঙ্গী নদীর খালবেষ্টিত কাপ্তাই লেকের বুকে বুড়িঘাট ইউনিয়নে অবস্থিত ছোট্ট একটি টিলার মতো ভূমিতে ফরিদপুরের দামাল ছেলে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গলে কর্মরত ল্যান্স নায়েক শহীদ আবদুর রউফ চিরনিদ্রায় শায়িত। স্বাধীনতা যুদ্ধের এই বীর সেনানীর সমাধি আজ ইতিহাসের উজ্জ্বল সাক্ষী। পাকিস্তানি হানাদারদের আক্রমণ থেকে সঙ্গীয় ১৫০ জনকে নিরাপদ দূরত্বে সরে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য একাই সাতটি স্পিডবোট ও দুটি জাহাজে করে আসা পাকিস্তানি কামান্ডো বাহিনীর সঙ্গে লড়তে লড়তে শত্রুদের পিছু হটতে বাধ্য করেন। 

তবে ততক্ষণে শত্রুরা মুন্সী আব্দুর রউফের অবস্থান নেওয়া বাঙ্কার চিহ্নিত করে তার মেশিনগানের সক্ষমতা থেকে দূরে সরে গিয়ে মর্টারশেলের গোলা ছুড়তে থাকে। একটি গোলা এসে বাঙ্কারে বিস্ম্ফোরিত হলে অদম্য সাহসী, দেশ রক্ষার অকুতোভয় সৈনিক মুন্সী আব্দুর রউফ সেখানেই শহীদ হন। তারিখটা ছিল ২০ এপ্রিল ১৯৭১। সেই সম্মুখযুদ্ধে হানাদারদের সাতটি স্পিডবোট ডুবিয়ে দেওয়াসহ জাহাজ ও সৈন্যদলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। এরপর শহীদ মুন্সী আব্দুর রউফকে এই বুড়িঘাটের জমিতে দাফন করা হয়। তখন জায়গাটা যেমন দুর্গম ছিল, তেমনি ঝোপঝাড় জঙ্গলে ঘেরা। যে কারণে স্বাধীনতার অনেক বছর পর ১৯৯৬ সালের ২৫ এপ্রিল কবরটির সন্ধান পাওয়া যায়। এরপর ২০০৬ সালের ২৫ মার্চ তার সমাধিস্থলে রাইফেলের ভাস্কর্যের আদলে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়। যা অনেক দূর থেকেও দেখা যায়। কাপ্তাই পানিপথের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা শহীদ মুন্সী আব্দুর রউফের সেদিনের একার বীরত্বের জন্য তার নির্দেশে সঙ্গীয় ১৫০ জন মুক্তিযোদ্ধা নিরাপদে সরে যেতে পেরেছিলেন। হালকা মেশিনগান দিয়ে একাই কুখ্যাত হানাদারদের বিশাল কমান্ডো বাহিনীকে নাস্তানাবুদ করার জন্য স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশ সরকার শহীদ মুন্সী আব্দুর রউফকে মরণোত্তর ল্যান্স নায়েকে পদোন্নতি ও বীরশ্রেষ্ঠ সম্মাননায় ভূষিত করে। মুক্তিযুদ্ধের সাতজন বীরশ্রেষ্ঠের মধ্যে ল্যান্স নায়েক শহীদ মুন্সী আব্দুর রউফ অন্যতম। সমাধির পাশে থাকা দেয়াল লেখনীতে তার বীরত্বের ইতিহাস রয়েছে। 

পড়ালেখায় উদাসীন থাকা শহীদ মুন্সী আব্দুর রউফ ছোটবেলা থেকেই দুর্দান্ত মেধাবী ও সাহসী ছিলেন। চাচার পদাঙ্ক অনুসরণ করে তিনিও পাকিস্তান রাইফেলসে যোগদান করেছিলেন। পরে স্বাধীনতা যুদ্ধে দেশবাসী দেখল, জানল তার মেধার ধার ও সাহসিকতা। সম্মুখযুদ্ধে কখনও কখনও মেধার দক্ষতায়, উপস্থিত বুদ্ধিতে নিজ বাহিনীর সুরক্ষায় পিছু হটেও শত্রুকে ঘায়েল করতে হয়। বুড়িঘাটের যুদ্ধে সেই তীক্ষষ্ট মেধারই বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছিলেন শহীদ মুন্সী আব্দুর রউফ। তিনি তার বাহিনীকে পিছু হটে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে শত্রুদের প্রতিহত করার জন্য একাই লড়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন। যদি তিনিও নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছুটতেন তাহলে হয়তো সঙ্গীয় পুরো মুক্তিবাহিনীর যোদ্ধারা হানাদারদের পৈশাচিক আক্রমণে ঘায়েল হয়ে যেতে পারত। স্যালুট হে মহান বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মুন্সী আব্দুর রউফ। দিন দিন সমাধিস্থলটি ভ্রমণপিপাসুদের কাছেও বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। অনেকেই যান শ্রদ্ধা জানাতে। কেউবা নিছক ভ্রমণের উদ্দেশ্যে। তা যা-ই হোক, সমাধিস্থলের পবিত্রতার প্রতি সবারই খেয়াল রাখা জরুরি।

এবার যাই পাহাড়ি নদী চেঙ্গীর ওপর
নবনির্মিত ব্রিজটি দেখতে। ভটভট শব্দ তুলে ট্রলার স্টার্ট। ছুটছে ট্রলার নানিয়ারচর বাজারের দিকে। কাপ্তাই হ্রদে নৌভ্রমণকালীন পানির বুকে জেগে থাকা সবুজে মোড়ানো টিলাগুলোর নয়নাভিরাম সৌন্দর্য ভ্রমণের আনন্দ বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। যেতে যেতে আধঘণ্টার মধ্যেই ট্রলার ঘাটে ভিড়ে। ততক্ষণে জুমার আজান হয়ে গেছে। ভাতের হোটেলে খাবার অর্ডার করে মসজিদে ঢুকে যাই। নামাজ শেষে কাপ্তাই লেকের সুস্বাদু রুই মাছ আর দেশি মোরগের গোশত দিয়ে পরিমাণের চেয়ে অতিরিক্ত ভাত খেয়ে ছুটে যাই ব্রিজে। ওয়াও! এ যেন ব্রিজ নয় বরং বলা যেতে পারে প্রকৃতির দান এক টুকরো স্বর্গের মাঝে গড়া কোনো ইমারত! অবাক নয়নে ব্রিজটির এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়াই। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার চেঙ্গী নদীর ওপর ব্রিজটি নির্মাণ করা হয়েছে। ব্রিজের আশপাশ প্রকৃতির মায়াবী চাদরে ঢাকা। নিজের চোখ দিয়ে না দেখা পর্যন্ত এর সৌন্দর্য বোঝা মুশকিল। ব্রিজটি নির্মাণের সুফল এখন পুরো রাঙামাটির বাসিন্দারা পাচ্ছে। সেই সঙ্গে নানিয়ারচর যেতে ভ্রমণপিপাসুদের জন্য সড়কপথেও বেশ স্বাচ্ছন্দ্য বয়ে এনেছে। সব কিছু মিলিয়ে নানিয়ারচর ভ্রমণ অভিজ্ঞতার ঝুলি সমৃদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলোও স্মৃতির আঙিনায় আজীবন গেঁথে রবে।

যেভাবে যাবেন :ঢাকা-রাঙামাটি রুটে বিভিন্ন কোম্পানির বাস সার্ভিস রয়েছে। রাঙামাটি রিজার্ভ বাজার নৌঘাট থেকে রিজার্ভ ট্রলার/স্পিডবোটে দিনে দিনে ঘুরে আসা যাবে। এ ছাড়া যাত্রীবাহী জাহাজও চলাচল করে।

মধ্যপ্রাচ্যের ভাড়া কমাল বাংলাদেশ বিমান
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পর্যটনের ধরন বদলে যাচ্ছে

আপনার মতামত লিখুন