শনিবার, ০১ অক্টোবর ২০২২ | ১৬ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ
ইভেন্ট

পর্যটন শিল্পের উৎকর্ষ সাধনে ‘ডাহুক’

নিজস্ব প্রতিবেদক
০৪ জানুয়ারি ২০২২

নদীমাতৃক এই দেশের ভূখণ্ড জুড়ে অসংখ্য নদ-নদী, হাওর-বাওর ছড়িয়ে আছে জালের মতো। সেসবের তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছে জনপদ। তাদের বলা যায় জলজ মানুষ। প্রকৃতির বুকে বেড়ে উঠে তারা। তাদের জীবনের ওতপ্রোত অংশ হয়ে থাকে সেই জলের গম্ভীর গর্জন কিংবা সেখানকার মেঘে ঢাকা বিষণ্ণ আকাশ। এই মানুষগুলো অজস্র গল্প লালন করে, তবে তারা অনেকটাই বিচ্ছিন্ন। তাই গল্পগুলো না বলাই থেকে যায়। এই সমস্ত গল্প সংকলিত করতে, এই মানুষগুলোর জীবন এক সুতোয় বাঁধার প্রয়াসেই ডাহুকের পথচলা।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অন্যতম নিদর্শন টাঙ্গুয়ার হাওর। বৃহত্তর সিলেটের হাওরকন্যা নামে খ্যাত সুনামগঞ্জ জেলা, যার ধর্মপাশা ও তাহিরপুর উপজেলায় হাওরটি অবস্থিত। হাওর এলাকা ঘিরে রয়েছে ৮৮টি গ্রাম। সুন্দরবনের পর এটি আন্তর্জাতিকভাবে ঘোষিত বাংলাদেশের দ্বিতীয় ‘রামসার সাইট’। কিন্তু এতো সম্ভাবনাময় এক পর্যটন কেন্দ্রে প্রায়শই মেলে অব্যবস্থাপনার প্রমাণ। দেখা যায় পানিতে ভেসে থাকা প্লাস্টিক বর্জ্য।

ডাহুকের প্রতিষ্ঠাতা রেজা শাওনের সঙ্গে কর্মীরা

ডাহুক একটি সামাজিক উদ্যোগ যার মূল লক্ষ্য জনপদের মাঝে সংযোগ সাধন করে মানুষের পর্যটন অভিজ্ঞতার উৎকর্ষ তৈরি। স্বভাবতই, পর্যটন কেন্দ্রগুলোর প্রতি সবচেয়ে প্রগাঢ় আবেগ কাজ করে স্থানীয় মানুষের। তাই ডাহুক চেষ্টা করে এসব পর্যটন কেন্দ্র সংরক্ষণে স্থানীয় মানুষদের কাজে লাগাতে। কারণ তারা নিজেরা সচেতন হলে পর্যটকদেরও তারাই সচেতন করতে পারবে। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসের দিকে যাত্রা শুরু করে ডাহুক।

সাক্ষাৎকারে ডাহুকের প্রতিষ্ঠাতা রেজা শাওন জানান, 'ডাহুক স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পর্যটক ও স্থানীয়দের মধ্যে সংযোগ সাধন এবং পর্যটন কেন্দ্র সংরক্ষণ—মূলত এই তিনটি লক্ষ্য সামনে রেখে কাজ করে।'

হাওরের নৌকা এবং খাবারের অভিজ্ঞতাকে এক করার চেষ্টা করে ডাহুক। যাত্রার শুরুর দিকে স্থানীয় নৌকাগুলোতে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ভালো ছিল না, অন্যদিকে নৌকার পাটাতনে মাঝির রান্না অনেক পর্যটকই খেতে পারতো না। ডাহুক এখানেই নিয়ে আসে এক সুন্দর সমাধান। তারা খাবারের জন্য নৌকায় রান্না না করে বরং স্থানীয় গ্রামে রান্নার প্রস্তাব দেয়, ফলে একদিকে পর্যটকরা ভালো খাবার খেতে পারে, অন্যদিকে স্থানীয় মানুষও তাতে খুঁজে পায় কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা। ডাহুকের স্থাপত্য বিভাগের সদস্যরা নৌকার জন্য বিশেষ নকশা তৈরি করে যাতে আছে সুষ্ঠু পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ও বর্জ্য ফেলার জন্য ডাস্টবিন। প্রতিষ্ঠাতা রেজা শাওন বলেন, 'আমরা আত্মবিশ্বাসের সাথে বলতে পারি আমাদের কোনো নৌকা থেকে একটি বর্জ্যও হাওরে পড়ে না।'

শুরুতে মাত্র দুটি নৌকা নিয়ে কাজ শুরু করে ডাহুক। গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে নতুন নকশার নৌকার প্রয়োজনীয়তা মাঝিদের বোঝানো ছিল কষ্টসাধ্য। কিন্তু একে একে তারা তা উপলব্ধি করে এবং এখন ১৩টি নৌকার মাঝি কাজ করে ডাহুকের অংশ হয়ে। উল্লেখ্য, পর্যটকদের সাথে সদাচরণ করা, তাদের জীবনের গল্প বলা, গান শোনানো—সর্বোপরি যোগাযোগ দক্ষতার উপর মাঝিদের প্রশিক্ষণ দেয় ডাহুক। সপ্তাহে যখন কাজের চাপ থাকে না তখন চলে হাওর থেকে প্লাস্টিক সংগ্রহের কাজ। ৪-৫ কেজি প্লাস্টিক সংগ্রহের জন্য মাঝিদের নির্দিষ্ট পরিমাণ পারিশ্রমিকেরও ব্যবস্থা করে ডাহুক।

আমাদের প্রতিটি পর্যটন কেন্দ্র আমাদের গর্ব, আমাদের মূল্যবান জাতীয় সম্পদ। এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ আমাদেরই দায়িত্ব। টাঙ্গুয়ার হাওরের পর এবার দেশের অন্যান্য জলাভূমির পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে ডাহুকের কর্মকান্ড সম্প্রসারিত করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান রেজা শাওন। এইসব পর্যটন কেন্দ্রের সৌন্দর্য্য টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে সব মানুষকে এক করার স্বপ্ন দেখেন এই তরুণ উদ্যোক্তা।

পর্যটনে আসছে নতুন বিধিনিষেধ
নতুন বছরেও দেশীয় ট্যুরের ওপর নির্ভর করতে হবে

আপনার মতামত লিখুন