শুক্রবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২২ | ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ
গোলাম কিবরিয়ার ভ্রমণ কাহিনী

পর্যটনের এগিয়ে চলা

গোলাম কিবরিয়া
১৯ ডিসেম্বর ২০২১

ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। পৃথিবীর আর কোনো দেশে এমন বৈচিত্র্যময় ঋতুর সমাবেশ সম্ভবত আর নেই। আর তাই তো কবি বলেছেন, এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের বাংলাদেশ।

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দেশের অন্য শিল্পের মতো পর্যটনও অনেকদূর এগিয়েছে। শত সমস্যা-সংকটের মাঝেও পর্যটন ছিল সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। নতুন নতুন পর্যটন গন্তব্য এই সম্ভাবনাময় সেক্টরকে আরও এগিয়ে নিয়ে গেছে। ভ্রমণপ্রিয় বাংলাদেশি পর্যটকরা একসময় দেশের বাইরে ঘুরতেই বেশি পছন্দ করতেন। কিন্তু বর্তমানে সেই অভিরুচি থেকে দূরে সরে এসে নিজ জন্মভূমির প্রাকৃতিক-ঐতিহাসিক স্থান ঘুরতেই মানুষ অনেক বেশি পছন্দ করেন।

সাগরের সৈকত বলতে বহুকাল ধরেই কক্সবাজার ছিল একমাত্র গন্তব্য। সাম্প্রতিক কালে কুয়াকাটা সি-বিচ কক্সবাজারের বিকল্প আকর্ষণ হিসেবে হাজির হয়েছে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বরিশাল বিভাগের দক্ষিণে এবং বৃহত্তর নোয়াখালীর দক্ষিণে মেঘনার অববাহিকায় এবং সেই সঙ্গে পায়রা, বিষখালী, আগুনমুখা ইত্যাদি নদীর মোহনায় আগেই ছিল অনেক দ্বীপ; সেই সঙ্গে গত ৫০-১০০ বছরে জেগেছে অনেক চর। এ চরগুলোতে একই সঙ্গে তৈরি হয়েছে অপরূপ বালুকাবেলা বা সি-বিচ। সমুদ্রের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে এসব সি-বিচে, তা এসব দ্বীপগুলোকে করে তুলেছে আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট। একই সঙ্গে প্রাকৃতিকভাবে এবং বন বিভাগের প্রচেষ্টায় প্রতিটি চরেই গড়ে উঠেছে ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট বা উপকূলীয় শ্বাসমূল বন বা বাদাবন। একদিকে সমুদ্রসৈকত, অন্যদিকে বাদাবন, আবার সেই বনে হরিণসহ নানা বন্যপ্রাণীর বসবাস। এতসব সম্পদ নিয়ে ওই চরগুলো ক্রমেই পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এর মাঝে উল্লেখযোগ্য হলো নিঝুম দ্বীপ; যা নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার অন্তর্গত ও চর কুকরিমুকরি, যা ভোলা জেলার দক্ষিণে চর ফ্যাশন উপজেলার অন্তর্গত। এ ছাড়া রয়েছে মনপুরা, যা ভোলা জেলার অন্তর্গত একটি উপজেলা এবং মৌডুবি, যা কুয়াকাটার পূর্ব দিকে, তৃতীয় সামুদ্রিক বন্দর পায়রা বন্দরের অপর পাশে রাঙ্গাবালী উপজেলায় অবস্থিত। এই সবকয়টি স্পটেই রয়েছে সামুদ্রিক বালুকাবেলা। পাশেই রয়েছে বনজঙ্গল। চারটি জায়গাতেই রয়েছে ঢাকা থেকে লঞ্চে করে যাওয়ার ব্যবস্থা; যা আমাদের পর্যটনে নতুন গতি সঞ্চার করেছে। এ ছাড়া প্রস্তাবিত সিলেটের বিছানাকান্দির পাশে একটি পর্যটন গ্রাম, পর্যটকদের জন্য হেল্প ডেস্কের উদ্যোগ ভবিষ্যতের পর্যটনে আশার আলো দেখাচ্ছে। এ ছাড়া গ্রামীণ পর্যটন নতুন সম্ভাবনা জোগাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান ড. সন্তোষ কুমার দেব গ্রামীণ পর্যটন নিয়ে নিজের অভিমত জানাতে গিয়ে বলেন, সমবায়ভিত্তিক পর্যটন উন্নয়নের মাধ্যমে সমাজের আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর আর্থিক সচ্ছলতার পাশাপাশি স্থায়ী উপার্জনের পথ সুগম হবে। পর্যটকরা এখন গ্রামমুখী। গ্রামের নান্দনিক সৌন্দর্য দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করে। বাংলাদেশে গ্রামীণ ট্যুরিজমকে সম্ভাবনাময় সেক্টর হিসেবে অভিহিত করেন ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) প্রেসিডেন্ট মো. রাফিউজ্জামান। তিনি মনে করেন, এ দেশের প্রকৃতি, পরিবেশ, জনগোষ্ঠী, কৃষ্টি, সংস্কৃতি গ্রামীণ পর্যটন প্রসারের অনুকূলে রয়েছে। এ ছাড়া তিনি যোগ করেন, সরকারের সমন্বিত উদ্যোগই পারে গ্রামীণ পর্যটনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে।

সম্প্রতি কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সাগরের পাড়ে ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভ নির্মাণ দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে পর্যটন নগরী কক্সবাজারের আকর্ষণ আরও বাড়িয়ে দেবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটক আকর্ষণে কক্সবাজারে তিনটি পর্যটন পার্ক তৈরির পরিকল্পনা করেছে বর্তমান সরকার। প্রতি বছর এতে বাড়তি ২০০ কোটি মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এ তিনটি ট্যুরিজম পার্ক হলো সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক, নাফ ট্যুরিজম পার্ক এবং সোনাদিয়া ইকো ট্যুরিজম পার্ক। পর্যটনশিল্পের গুণগত পরিবর্তন আনতে কক্সবাজার ও সুন্দরবনের পার্শ্ববর্তী এলাকায় 'এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোন' গড়ে তোলার জন্য কাজ চলছে। দেশের এই এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোনগুলোতে প্রচুর সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে; যা এ শিল্প-সংশ্নিষ্ট সবার জন্য ইতিবাচক খবর। বর্তমান সরকারের বেশ কিছু মেগা প্রকল্প হচ্ছে- পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প, পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্প, ঢাকায় মেট্রোরেল প্রকল্প, দোহাজারী হতে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু হয়ে ঘুমধুম পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ প্রকল্প, এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প, পায়রা বন্দর নির্মাণ প্রকল্প এবং সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ প্রকল্প।

ট্যুরিজম রিসোর্ট ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ট্রিয়াব) সভাপতি খবির উদ্দিন আহমেদ বলেন, 'বিশ্বে বিভিন্ন সার্ভিসের মধ্যে রিসোর্ট হচ্ছে পর্যটকদের সুস্বাস্থ্যের জন্য এক অনন্য স্থান। রিসোর্টগুলো বিশেষ করে গ্রামীণ রিসোর্ট স্বাস্থ্যনিবাস হিসেবে কাজ করে। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ২০১৯ সালে প্রণীত বিধিমালায় রিসোর্টের ডেফিনেশন হচ্ছে- রিসোর্টগুলো সমুদ্র,নদী বা হ্রদ, বিল বা ঝিল, দিঘি, হাওর-বাঁওড়, ডোবা-নালা, পাহাড়, বন-জঙ্গল,বাগানসহ উন্মুক্ত স্থানে হতে হবে। দেশের প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, রিসোর্টগুলো শহর থেকে দূরে গ্রামাঞ্চলে অবস্থিত। এখানে বিভিন্ন প্রজাতির প্রচুর পরিমাণ ফরমালিনমুক্ত শাকসবজি, ফলমূল, মাছ, মাংস ঔষধি গুণাগুণ সমৃদ্ধ খাবার, প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত শাকসবজি, ফলমূলসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য পাওয়া যায়, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, প্রকৃতির বৈচিত্র্য যদি সঠিকভাবে বিদেশিদের কাছে তুলে ধরা যায়, তবেই বাংলাদেশ হয়ে উঠবে বিশ্বে পর্যটনের এক অনন্য তীর্থস্থান। পর্যটনের এই বিপুল সম্ভাবনা থেকে কীভাবে দেশ লাভবান হবে, তা ঠিক করার এখনই উপযুক্ত সময়। এ জন্য পর্যটনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সব পক্ষকে নিয়ে একযোগে কাজ করতে হবে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের জিডিপি খাতে পর্যটনশিল্পের মোট অবদান ছিল ৮৫০.৭ বিলিয়ন টাকা। ইউনেস্কো ২০০৯ সাল পর্যন্ত বিশ্বের প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রায় ৮৯০টি অনন্য বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন স্থানকে বিশ্ব ঐতিহ্যস্থল হিসেবে ঘোষণা করেছে। ২০০৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের তিনটি স্থানকে বিশ্ব ঐতিহ্যস্থল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এগুলো হলো নওগাঁর পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, বাগেরহাটের মসজিদ শহর এবং সুন্দরবন। পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার ও বাগেরহাট মসজিদ শহর বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যভুক্ত প্রত্নস্থল। সুন্দরবন বিশ্ব প্রাকৃতিক ঐতিহ্যভুক্ত পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। আমাদের রয়েছে কক্সবাজারের পাশাপাশি সেন্টমার্টিন, হিমছড়ি, ইনানি বিচসহ দর্শনীয় স্থানগুলো। সিলেটের চা বাগান, জাফলং, রাতারগুল জলাবন, হাকালুকি হাওর, লালাখাল, ভোলাগঞ্জ, বিছানাকান্দি, তামাবিল, মাধবকুণ্ডের জলপ্রপাত, পাহাড়, ঝরনা সব মিলিয়ে নানা বৈচিত্র্যের সম্ভার রয়েছে সীমান্তঘেঁষা বিস্তীর্ণ সবুজ লীলাভূমি। ঐতিহ্যময় বাংলার সৌন্দর্য সুন্দরবন, বগুড়ার মহাস্থানগড়, দিনাজপুরের কান্তজীও মন্দির, রামসাগরসহ সারাদেশের আকর্ষণীয় সব পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে পর্যটকদের সামনে তুলে ধরতে হবে। পর্যটকদের সামনেও দেশকে চেনা-জানার একটি সুযোগ চলে এসেছে করোনা মহামারির কারণে। বাংলাদেশে পর্যটনের যাত্রা অনেক আগে শুরু হলেও নানা প্রতিকূল অবস্থা পেরিয়ে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আশার আলো ছড়াচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে পর্যটন শিল্প বাংলাদেশের জন্য হয়ে উঠতে পারে অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে। 

কক্সবাজারে পর্যটন ব্যবসার নামে চলছে নৈরাজ্য!
ওয়ালটনের ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ওয়ালকার্টের যাত্রা শুরু

আপনার মতামত লিখুন