সোমবার, ২৪ জানুয়ারি ২০২২ | ১১ মাঘ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
মতামত

কভিডকালে পর্যটনশিল্পে ধস ও সমাধান

কাজী ফারহানা ইসলাম
১৩ জানুয়ারি ২০২২
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

করোনাভাইরাসজনিত রোগের (কভিড) প্রাদুর্ভাবে পুরো বিশ্ব জর্জরিত ও আক্রান্ত। এই প্রাণঘাতী মহামারির জন্য মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থমকে গেছে, যার ফলে শুধু মানুষের স্বাভাবিক জীবনব্যবস্থাই নয়, দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছে। পর্যটনশিল্পে ধস নেমেছে। পর্যটনশিল্পের সঙ্গে জড়িত যারা তাদের এই ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রথম চীনের উহান শহর থেকে করোনাভাইরাসে শনাক্ত রোগীর খবর পাওয়া যায়। পরে দ্রুতই বিশ্বের অধিকাংশ দেশে ছড়িয়ে যাওয়া কভিডের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে পর্যটন কেন্দ্র। বিশ্বের এক দেশ থেকে অন্য দেশে ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করার পর বিশ্বের পর্যটন স্পটগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়।

২০২০ সালের ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম কভিড-আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হওয়ার পর এবং দ্রুত এর প্রভাব বৃদ্ধি ফলে সরকার ২০০০ সালের ২৬ মার্চ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে এবং দেশের সব পর্যটন কেন্দ্র, হোটেল-মোটেল, রেস্টুরেন্ট, বিনোদন কেন্দ্র, নৌপথ, সড়ক, রেল ও বিমান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এর ফলে ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয় পর্যটনশিল্পের সঙ্গে জড়িত সব শ্রেণির মানুষকে। এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত ৪০ লাখ কর্মী বেকার হয়ে পড়েছে এবং তাদের ওপর নির্ভরশীল দেড় কোটিরও বেশি মানুষ গভীর অনিশ্চয়তায় নিমজ্জিত হয়েছে।

২০২০ সালের শুরুটা পর্যটনের জন্য বেশ ভালো একটা সময় ছিল। বিশ্ব পর্যটন সংস্থার মতে, ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে পর্যটকের সংখ্যা বিগত বছরের তুলনায় দুই শতাংশ বেশি ছিল। তবে কভিডের প্রভাবে ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে ব্যাপক নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে।

রিপোর্টে বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারি মাসে বিগত বছরের তুলনায় ৯ শতাংশ এবং মার্চ মাসে ৫৭ শতাংশ পর্যটকের আগমন কম হয়েছে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চল।

২০১৯ সালে বিশ্ব অর্থনীতির জিডিপি খাতে পর্যটনের ভূমিকা ছিল দুই দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলার, যা ছিল মোট জিডিপির ১১ শতাংশ। করোনার প্রভাবে এখন পর্যন্ত পর্যটন খাতের ক্ষতির পরিমাণ দুই দশমিক এক ট্রিলিয়ন ডলার। ২০১৯ সালে বিশ্বে পর্যটকের সংখ্যা ছিল এক দশমিক পাঁচ বিলিয়ন।

ওয়ার্ল্ড ট্যুরিজম অরগানাইজেশন (ডব্লিটিও) ধারণা করেছিল যে, সে বছর পর্যটকের হার আরও চার থেকে পাঁচ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে, কিন্তু কভিডের ফলে সে হার হ্রাস পেয়েছে। এজন্য প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়েছিল। ভবিষ্যতে এর প্রভাব ব্যাপক হতে যাচ্ছে।

কভিড চলে গেলেও আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পৃথিবীর বেশ সময় লাগবে। কভিডের প্রাদুর্ভাবে অসংখ্য মানুষ বেকার জীবনযাপন করছে, মানুষের সঞ্চয় সীমিত হয়ে পড়েছে, জীবনযাত্রার মান কমে গেছে এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়েছে, সেজন্য আগের তুলনায় মানুষ ভ্রমণে অনীহা প্রকাশ করবে। তাই করোনার প্রভাব চলে গেলেও পর্যটনশিল্পের আগের গতি ফিরে আসতে আরও দু-তিন বছর সময় লাগতে পারে। করোনার ভয়াল থাবায় পর্যটননির্ভর দেশ, যেমনÑথাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, ইতালি ও ফ্রান্সের মতো দেশগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতগ্রস্ত হয়েছে।

বাংলাদেশের পর্যটনশিল্প উদীয়মান শিল্প। বিগত বছরগুলোয় এই শিল্পের ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। কিন্তু কভিডের প্রভাবে বর্তমানে এই শিল্পে ধস নেমেছে। দেশের সব ধরনের পর্যটন কেন্দ্র, হোটেল- মোটেল ও রেস্টুরেন্ট দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় এই শিল্প ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। বাংলাদেশের জিডিপিতে পর্যটনের অবদান প্রায় তিন শতাংশ।

প্যাসিফিক এশিয়া ট্রাভেল অ্যাসোসিয়েশন (পাটা) বাংলাদেশ চ্যাপ্টারে এক সমীক্ষা অনুযায়ী বলেছে, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত মোট পাঁচ মাসে সার্বিক পর্যটনশিল্পে ৯ হাজার ৭০৫ কোটি টাকার ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রায় তিন লাখ ৯ হাজার ৫০০ জনের চাকরি হারানোর শঙ্কা রয়েছে। হোটেল ও বিভিন্ন রিসোর্ট-রেস্তোরাঁয় ক্ষতির পরিমাণ প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা এবং কর্মহীন প্রায় দুই লাখ ৫০ হাজার জন, ট্রাভেল এজেন্সিতে তিন হাজার কোটি টাকা এবং কর্মহীন প্রায় ১৫ হাজার জন, ট্যুর অপারেশনে চার হাজার ৫০ কোটি টাকা (ইনবাউন্ড, আউটবাউন্ড ও ডমিস্টিক) এবং কর্মহীন ৪১ হাজার জন, পর্যটন, পরিবহন ও জাহাজে ৫৫ কোটি টাকা এবং কর্মহীন হবে এক হাজার ৫০০ জন।

তাছাড়া পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, কভিড মহামারি ফলে বাংলাদেশের ভ্রমণ ও পর্যটন খাতে প্রায় ১৪ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পেও বিপর্যয় ঘটেছে। এই বিপর্যয়ের স্থায়িত্ব কভিডের সংক্রমণ ও নির্মূলের ওপর নির্ভর করছে। বিশ্বের পর্যটনশিল্প আগেও বিভিন্ন প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েছে। ২০০০ সালের পর সার্স, মার্স ও ইবোলার মতো ভাইরাস হানা দিয়েছে। তবে পুরো বিশ্ব এর প্রভাব কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে। তাই করোনার বর্তমান বিপর্যয়কে দ্রুত কাটিয়ে উঠতে আমাদের সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

পর্যটনশিল্পের বিপর্যয়কে কাটিয়ে উঠতে মহামারির নিয়ন্ত্রণে বিশেষজ্ঞদের এগিয়ে আসতে হবে। সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করার মাধ্যমে তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। পর্যটনশিল্পের সঙ্গে জড়িত ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের তালিকা প্রণয়নের মাধ্যমে তাদের সংকটকালে প্রণোদনা নিশ্চিত করতে হবে। সংকটকালে কর্মী ছাঁটাই না করে তাদের ছুটি দিয়ে বা কাজের সময় হ্রাস করে ক্ষতির পরিমাণ হ্রাস করার দিকে চেষ্টা করতে হবে। সংকটকালে সরকারি বা বেসরকারি উৎস থেকে নেয়া ঋণের সুদ আদায় স্থগিত রাখতে হবে। সরকারকে পর্যটনশিল্পের সঙ্গে জড়িত সব শ্রেণির সঙ্গে যোগাযোগ নিশ্চিত করতে হবে। তাদের সুবিধা-অসুবিধার দিকগুলো গুরুত্বসহ বিশ্লেষণ করতে হবে। পর্যটনশিল্পের সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক সাহায্যের জন্য জরুরি তহবলি গঠন করে তাদের যথাসময়ে সাহায্য প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। ঋণ গ্রহণের ব্যবস্থাকে সহজ করতে হবে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে তারল্য সুবিধা প্রদানের জন্য ক্ষুদ্র, মাঝারি ও স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা, যেমন ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল এবং দ্রুত ও ভর্তুকিযুক্ত ঋণ পদ্ধতির উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। পর্যটনশিল্পের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন আইন ও বিধিমালার পর্যালোচনা ও সহজীকরণ করতে হবে। ভোক্তা ও পর্যটকের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। অগ্রিম পরিশোধিত অর্থ ফেরত ও পর্যটন এলাকায় তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। পর্যটনশিল্পের সঙ্গে জড়িত কর্মীদের নতুন পণ্য, বাজার ব্যবস্থা, বিপণন, প্রমোশন প্রভৃতি বিষয়ে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। তাদের ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। কভিড সংকটকালে আঞ্চলিক, জাতীয় ও বিশ্ব সংস্থা পর্যায়ের

আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে, বা সামনে ঘোষণা করা হবে, তাতে পর্যটনশিল্পকে অগ্রাধিকার ও ক্ষতিগ্রস্ত খাত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পর্যটকদের আস্থা অর্জনের জন্য এবং স্থানীয় জনগণকে সচেতন করতে পর্যটন-সংক্রান্ত প্রচার-প্রচারণা করতে হবে। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড কর্তৃক প্রদানকৃত ট্যুরিজম ফেলোশিপ প্রাপ্ত প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট কমিটির (সিএমসি) সুপারিশ, বেসরকারি বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনসহ সব প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগের বিষয়ে মিডিয়ায় প্রচার করতে হবে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যটকদের প্রতিক্রিয়া নিয়মিত পর্যালোচনা করে পর্যটন খাতের পুনরুদ্ধার ও সমন্বয় করতে হবে। পর্যটনশিল্পের জন্য বিভিন্ন খাতকে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে হবে। পর্যটনশিল্পে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে হবে এবং দক্ষ জনবল নিয়োগ করতে মেলার আয়োজন ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের উন্নয়ন করতে হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এমন পর্যটন প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সাহায্য, যেমন ঋণ ও ট্যাক্স সুবিধা দিতে হবে। করোনার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পর্যটনশিল্পকে গতিশীল করতে যথাযথ পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে এবং সংকট থেকে পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও একটি শক্ত অবস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে তা বাস্তবায়ন করতে হবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামি শিক্ষা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

থাইল্যান্ড ভ্রমণ: বিদেশি পর্যটকদের দিতে হবে প্রবেশ ফি
রেড জোন রাঙামাটি, বাড়তি সতর্কতা প্রশাসনের

আপনার মতামত লিখুন